ঈদ ও ঈদ-পরবর্তী যাত্রা ঘিরে দেশের আন্তঃজেলা বাস পরিবহনে নতুন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলেও টিকিটে সেই ভাড়ার পরিমাণ উল্লেখ করা হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, জরিমানা এড়াতে পরিবহন শ্রমিকরা ইচ্ছাকৃতভাবে টিকিটের ভাড়ার অংশ ফাঁকা রেখে দিচ্ছেন। এতে যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিলেও প্রমাণ দেখিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর নজরদারি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার হওয়ায় একটি অংশ এই নতুন কৌশল নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি পরিবহন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগে জরিমানার ভয়েই অনেক পরিবহন শ্রমিক ইচ্ছাকৃতভাবে টিকিটে ভাড়ার পরিমাণ লিখছেন না বলে দাবি করেছেন যাত্রীরা। তারা বলছেন, টিকিটে ভাড়া উল্লেখ না থাকায় অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রমাণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। যাতে ভোক্তা অধিদপ্তরে অভিযোগ দেওয়া না যায়— এ জন্যই তারা ইচ্ছা করে ভাড়ায় অঙ্ক টিকিটে লিখছেন না।
জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে আসা বাসাগুলোর একই অবস্থা। ওই সব বাসের টিকিটগুলোতে ভাড়ার অঙ্ক লেখা নেই। তারিখ, সময় ও স্থানের নাম থাকলেও ভাড়ার জায়গা খালি। এ বিষয়ে বরগুনা থেকে আসা গ্রীণভিউ গাড়ির দায়িত্বরত এক শ্রমিক জানান, ভোক্তা অধিদপ্তর বেশি ভাড়া নিলে জরিমানা করছে। এই ভয়ে কাউন্টারগুলো ভাড়ার অঙ্ক লিখছে না। ভাড়ার অঙ্ক লিখলে ওই টিকিট দেখিয়ে যাত্রী অভিযোগ দেয়। আর অভিযোগ দিলে তারা (ভোক্তা অধিদপ্তর) জরিমানা করে। এই জরিমানা থেকে বাঁচতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
সায়েদাবাদের একজন পরিবহন শ্রমিক বলেন, ঈদের সময় ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে যাত্রা শেষে খালি বাস ফিরিয়ে আনা এবং ঢাকা থেকে বের হওয়ার সময় যাত্রী না থাকার কারণে বাসের লোকসান এড়াতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়। তিনি জানান, এই সময়ে যাত্রীর চাপের তুলনায় বাসের কম সংখ্যা এবং ফেরার পথে খরচ মিলিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিভিন্ন রাস্তায় সরকার যে টোল আদায় করে তা যদি মওকুফ করা হয়, তাহলে সাধারণ ভাড়াই যথেষ্ট হবে। অন্যদিকে, বাগেরহাট থেকে ঢাকায় আসা রফিকুল ইসলাম জানান, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হলেও টিকিটে কোনো অঙ্ক লেখা থাকে না। ফলে অভিযোগ করতে গেলেও যাত্রীরা কার্যকর প্রমাণ দেখাতে পারেন না, যা তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার হওয়ায় চালক-হেলপাররা সতর্ক হয়ে উঠেছেন। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগে জরিমানা এড়াতেই টিকিটে ভাড়া উল্লেখ না করার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টিকিটে ভাড়া উল্লেখ না করা নিজেই একটি অনিয়ম। বিষয়টি নজরে রেখে অভিযান পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের কাছ থেকেও অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের এই প্রবণতা বন্ধে নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর শাস্তি এবং যাত্রীদের সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। অন্যথায়, এটি আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা এই বিষয়ে বলেন, যদি কেউ আইনের বাইরে কোনো কার্যক্রম চালায়, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদের আগে অভিযান পরিচালিত হয়েছে। আমাদের নজরে যেসব ঘটনা এসেছে, তাতে আমরা আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিয়েছি। তিনি আরও বলেন, যদি সাধারণ মানুষ অভিযোগ দান করেন, আমরা তা অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারি। আমাদের অধিদপ্তরে জানাতে পারেন কোথায় এই ধরনের কার্যক্রম হচ্ছে, আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস এম আহম্মেদ বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা যেটা জানি, প্রত্যেকটা জেলায় টার্মিনালে আমাদের মালিক সমিতির প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার প্রতিনিধি, ডিসি, টিএনও, ইউএনও এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট— তারা সবাই উপস্থিত থাকেন। যে রকম আমার কাছে কালকে দুটি রিপোর্ট আছে— একটা পিরোজপুর জেলার, একটা বরিশালের। সেখানে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিদপ্তর।’ এখনও টিকিটের গায়ে ভাড়ায় অঙ্ক লিখছে না, কেন লিখছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সোজা কথা ঢাকা থেকে যাইতেও এসবকে আমরা প্রশ্রয় দেইনি। আসার সময়টাও আমরা প্রশ্রয় দিচ্ছি না। বিক্ষিপ্ত যে কিছু হতে পারে না— তা না, এটা আমি বলব না। দেখা যাচ্ছে যে, কিছু পকেট টার্মিনাল আছে। কিছু বাস আবার উপজেলা থেকে আসে, সেখানে তো কোনো তদারকি নেই।’
যাতে জরিমানার মুখোমুখি না হতে হয়, সে কারণে এই ধরনের কাজ হচ্ছে। এ বিষয়ে শ্রমিক নেতা জানান, এটি কখনো কখনো হয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, ঢাকা থেকে যাত্রা শেষে যাত্রী কম থাকলে মিনিবাস বা টেম্পোতে যেতে হয়। তখন যাত্রীরা যেতেই হয়, তাই কিছু অনিয়ম ঘটে। তবে যারা আমাদের টার্মিনালে বছরভর ব্যবসা চালান, তারা অতিরিক্ত ভাড়া নিতে পারেন না। বিআরটিএ’র নির্ধারিত চার্ট অনুযায়ী সব ভাড়া হিসাব করা হয়, আর অনলাইনে টিকিট করা হলে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয় না।
