বেনাপোল স্থলবন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে জব্দ করা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় পণ্য আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় বন্দর কর্মকর্তাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। বুধবার (১০ জুন) সন্ধ্যায় বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আমির মাহমুদ আরেফিন বাদী হয়ে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে পুলিশ প্রাথমিকভাবে আসামিদের নাম প্রকাশ করেনি। এদিকে স্থলবন্দরের নিরাপদ শেড থেকে এভাবে আমদানি পণ্য গায়েব হওয়ার ঘটনায় বন্দর ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক সংগঠনের নেতাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সাফা ইমপেক্স’ গত ১২ মার্চ ভারত থেকে একটি পণ্যের চালান আমদানি করে। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে চালানটি গ্রহণ করে বেনাপোলের মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজ। পরে চালানটি বেনাপোল স্থলবন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে রাখা হয়। আমদানি নথিতে পণ্য হিসেবে বেকিং পাউডারের ঘোষণা দেওয়া হলেও কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষায় সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
পরীক্ষাকালে ১০৮ কার্টনে ঘোষণাবহির্ভূত প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় দামি শাড়ি, থ্রি-পিস, বেবিওয়্যার, ফেসওয়াশ, ক্রিম, লোশনসহ বিভিন্ন প্রসাধনী পাওয়া যায়। এসব পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির মাধ্যমে ২ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ৫১৫ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হচ্ছিল। পরে ১৪ মার্চ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এসব ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস ও প্রসাধনী জব্দ করে বেনাপোল বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে সিলগালা করে রাখে। গত ২ জুন কাস্টমস কর্মকর্তারা জব্দ পণ্যগুলো পুনরায় পরিদর্শন করতে গিয়ে হতবাক হন। দেখা যায়, শেড থেকে দামি ভারতীয় পণ্যগুলো সরিয়ে সেখানে নিম্নমানের দেশীয় পণ্য ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, জব্দ পণ্যের পরিবর্তে যে দেশীয় পণ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো বাংলাদেশি বসুন্ধরা ও মেঘনা শিল্প গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির নাম মুদ্রিত কার্টনে রাখা ছিল। এছাড়া দেশীয় সংবাদপত্রে মোড়ানো এবং বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের স্টিকারযুক্ত পিপি বস্তাও পাওয়া গেছে। এসব আলামত প্রমাণ করে পণ্যগুলো দেশের ভেতর থেকেই চুরির উদ্দেশ্যে বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
এই ঘটনায় বন্দরের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি সহযোগিতার সন্দেহ করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রায় ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকার রাজস্ব পরিশোধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে এবং শেড ইনচার্জকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। এদিকে অভিযুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান দাবি করেন, জব্দ হওয়া চালানটি খালাসের জন্য তাদের প্রতিষ্ঠান কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজু নামের এক ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় কাস্টমসকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ হোসেন জানান, বন্দর থেকে পণ্য গায়েবের ঘটনায় ১৮ জনের নামে মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তের স্বার্থে এখনই আসামিদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
