ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, কর্মকর্তাদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ঘরে বসে কাজ করার সুবিধা এবং অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আংশিকভাবে অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়টিও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সব সরকারি সংস্থাকে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য নিজস্ব প্রস্তাব তৈরি করতে বলা হয়েছে। এসব প্রস্তাবনা আগামী মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আপাতত তিন মাসের একটি স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে সরকার মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গ্রহণ করবে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের চড়া দাম, আমদানি খরচ বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে সরকার এই সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নেওয়ার পথে এগোচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনায় থাকা অন্তত আটটি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়তি একদিন যোগ করা অথবা কর্মকর্তাদের সপ্তাহে দুদিন ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। এছাড়া অফিসের কাজ দ্রুত শুরু করা অথবা কাজের মোট সময় কমিয়ে আনার প্রস্তাবও রয়েছে। বিদ্যুৎ খরচ কমাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহের অর্ধেক ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মন্ত্রিসভায় ঠিক করা হবে কোন পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ কমানো নিয়েও সরকার বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ঋণ এড়িয়ে চলা এবং কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সরকার এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ছয় মাস থেকে এক বছরের পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপের বাইরে আরও কার্যক্রম নিতে হতে পারে। সূত্র জানিয়েছে, কিছু মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে তাদের নিজস্ব কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থার খসড়া তৈরি শুরু করেছে।
জ্বালানি মজুত রোধে সরকার ইতোমধ্যে গত কয়েক দিনে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, চাপ কমাতে এখন চাহিদাপক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হতে পারে। চাহিদাপক্ষ নিয়ন্ত্রণ বা ডিএসএম হলো ইউটিলিটি-চালিত এমন কিছু কৌশল, যার লক্ষ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরনকে প্রভাবিত করা, কমানো বা সরিয়ে নেওয়া। বিশেষ করে যখন বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে থাকে।
এই প্রতিবেদনের জন্য যোগাযোগ করা কর্মকর্তারা কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আরও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, কোভিডকালীন অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে, সিদ্ধান্তগুলো আরও আগেই নেওয়া যেত। প্রয়োজনে বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকও ডাকা যেতে পারে। আরেকজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, বর্তমান মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য নতুন হওয়ায় সংকটকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতে পারে। তিনি অতীতের সংকট মোকাবিলা করেছেন এমন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন।
গতকাল রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা ফোন ধরেননি। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গতকাল অফিসগুলোকে চলতি মাসের শুরুর দিকে দেওয়া জ্বালানি সাশ্রয় সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে দিনের বেলা প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা এবং ব্যবহার না করলে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ রাখা।
অফিসগুলোকে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার ও বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রতিটি অফিসে এই নিয়মগুলো তদারকি করতে সরকার একটি ‘ভিজিল্যান্স টিম’ বা নজরদারি দল গঠন করবে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশও এর আঁচ পাচ্ছে, কারণ জ্বালানি ও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, যা তেল ও এলএনজি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই প্রণালিতে যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের ওপর প্রভাব ফেলে, কারণ দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বিদেশি গ্যাস ও জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সরবরাহ সংকটের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় আমদানি কমিয়ে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হয়েছে, যেখানে দাম অনেক উঁচু। এছাড়া যুদ্ধের প্রভাবে পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ খাত ফার্নেস অয়েলের মতো ব্যয়বহুল বিকল্পের ওপর নির্ভর করছে। পাশাপাশি দেশের সীমিত শোধন ক্ষমতার কারণে বেশি দামে পরিশোধিত জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, পেট্রোবাংলা সতর্ক করেছে যে আগামী মাসগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমতে পারে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, তবে সম্প্রতি কেনা এলএনজি যদি সময়মতো পৌঁছায়, তাহলে এপ্রিল মাসে কোনো প্রভাব পড়বে না।
