ছয় বছর কিস্তি না দিয়েও খেলাপি নন মির্জা ফখরুলের ভাই

নিশ্চিন্তপুর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এখন বন্ধ। প্রতিষ্ঠানটির বিপরীতে ২২ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যা সম্পূর্ণ খেলাপি। তবুও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী হিসেবে মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে পুনঃতফসিলের সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহক। এর আগেও একাধিকবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনো কিস্তি পরিশোধ করা হয়নি। এই গ্রাহকের নাম মির্জা ফয়সাল আমিন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সহোদর। জানা গেছে, ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা থেকে নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল, যা বর্তমানে ২২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। শুরুতে ঋণ কিছুটা পরিশোধ করা হলেও গত ছয় বছর ধরে কোনো কিস্তি দেওয়া হয়নি।

জনতা ব্যাংক জানিয়েছে, খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৬ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনার ভিত্তিতে মির্জা ফয়সাল আমিনকে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তার রাজনৈতিক পরিচয় এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাকে ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি, পরে মেসেজ পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান জানান, কারখানাটি বর্তমানে বন্ধ থাকায় ০৭/২০২৫ বিআরপিডি সার্কুলার অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা খেলাপি ঋণ আদায়ে অত্যন্ত কঠোর। একটি ব্যাংক এত খেলাপি ঋণ রেখে চলতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

জনতা ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিশ্চিন্তপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের জন্য মোট প্রকল্প ব্যয় ২১ কোটি ৯৪ লাখ টাকার ৫০:৫০ অনুপাতে ১০ কোটি ৯৭ লাখ টাকার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ঋণ অনুমোদিত হয় মির্জা ফয়সাল আমিনের নামে। এই ঋণ ২০১১ সালের ২৫ মার্চ আদায়যোগ্য হয়। পরে ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ ঋণ পুনর্গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তিনি চলতি মূলধন ঋণ হিসেবে ২০ শতাংশ মার্জিনে ৪ কোটি টাকা সুবিধা নেন। এছাড়া ২০ শতাংশ মার্জিনে ৮ কোটি টাকার পণ্য ঋণ এবং কাঁচামাল আমদানি করার জন্য ১০ শতাংশ মার্জিনে ১০ কোটি টাকার এলসি লিমিট অনুমোদিত হয়, যা ২০১১ সালের ৩০ জুন কার্যকর হয়। ২০১০ সালের ৬ আগস্ট প্রকল্পের পক্ষে পিসিআর ইস্যু করা হয়।

ব্যাংককে মির্জা ফয়সাল আমিন জানান, ২০০৭ সালের (১/১১)-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা বিরোধী রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ত থাকার কারণে সরকারের রোষানলে পড়ে। যার কারণে ১৭ বছর পর্যন্ত উৎপাদন ব্যাহত হয়। প্রকল্পটি শুরু থেকেই বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়, যা উৎপাদনকে ব্যাহত করে।তবে সেখানে মিশ্র সারের চাহিদা কম থাকার দাবি করা হয়। কিন্তু এই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। মিশ্র সার, বিশেষ করে এনপিকেএস (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার) যুক্ত সারের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ এটি সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করে এবং ফলন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ায়। এছাড়া ২০০৬ সালে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করার কারণ হিসেবে কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, দফায় দফায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কথা বলা হয়। বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৫/২০১৯ মোতাবেক ঋণ পুনঃতফসিলের সুয়োগ দেওয়া হলেও আবারও পরিশোধে ব্যর্থ হয়। পুনরায় খেলাপি ঋণে পরিণত হয়।

বিএনপির সময়ে শুরু হলেও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিশ্চিন্তে জনতা ব্যাংক থেকে নানা সুবিধা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিস্তি পরিশোধে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছে জনতা ব্যাংক। এমনকি ব্যবসা শুরুর জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ওই সময় আরও প্রায় ১১ কোটি ঋণ দেওয়া হয় মির্জা ফয়সালের প্রতিষ্ঠানটিকে। নতুন করে এই টাকা পাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু বিগত ১৭ বছরে সেই ঋণ পরিশোধের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

This will close in 5 seconds