ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীতে প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পরও শিল্পায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। এখন পর্যন্ত মাত্র আটটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেছে, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে শুধু ৫৫ জনের। সরেজমিনে গিয়ে একটি কারখানাও বন্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। এদিকে বরাদ্দ দেওয়া ৮৮টি প্লটের মধ্যে ৫৯টি এখনো ফাঁকা পড়ে রয়েছে। ৮০টি কারখানা স্থাপনের লক্ষ্য থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ১১টি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাব, নিরাপত্তা সংকট, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার কারণে প্লট মালিকরা দেশের ৭৫তম বিসিক শিল্পনগরীতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
জানা গেছে, মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীতে ২০২০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি কারখানা উৎপাদনে যায়। পরে ২০২২ সালে এয়াকুব অটো রাইস মিল বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর এবি কমোডিটিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলক উৎপাদন চালু হয়। সব মিলিয়ে ছয় বছরে মাত্র আটটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পেরেছে, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৫৫ জনের। এদিকে লোকসানের কারণে খান অ্যাকসেসরিজ নামে একটি কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বিসিক কর্মকর্তাদের দাবি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে অনেক কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না। এ সমস্যার সমাধানে ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে চিঠিও দিয়েছে বিসিক কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, ২০০৯ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মিরসরাই পৌরসভার পূর্ব তালবাড়িয়া রেলস্টেশন এলাকায় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের জন্য ১৫ দশমিক ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ২২ কোটি ৯৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়, যা প্রথম সংশোধনীতে বাড়িয়ে ২৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০১৩ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে ২০১৫ সালের ১২ মে একনেক বৈঠকে দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ২৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা করা হয়। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ ২০১৭ সালের জুনে সম্পন্ন হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার দুই বছর পর ৮৮টি প্লটের বিপরীতে ১১৪টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ৮৮ জন শিল্পোদ্যোক্তাকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় ১৪ জনের প্লট বাতিল করা হয়। পরে ওই ১৪টি প্লটের জন্য ৫৬টি আবেদন জমা পড়ে এবং যাচাই শেষে সেগুলোও বরাদ্দ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ৮৮টি প্লট ৮০ জন শিল্পোদ্যোক্তার মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। উদ্যোক্তারা পাঁচ বছরের মধ্যে নয় কিস্তিতে প্লটের মূল্য পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন, যেখানে প্রতি বর্গফুট জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০০ টাকা।
মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীতে এ-টাইপ প্লট ২৭টি, বি-টাইপ প্লট ৩৩টি ও সি-টাইপ প্লট ২৭টি। প্লট বরাদ্দ কমিটি প্রকৌশল খাতে ১৯টি, তৈরি পোশাক খাতে ১৬টি, খাদ্য ও খাদ্যজাত খাতে ১৯টি, কেমিক্যাল অ্যান্ড অ্যালাইড খাতে ১০টি, বন ও বনজাত খাতে তিনটি, প্যাকেজিং খাতে আটটি, সিরামিকস ও নন-মেটালিক খাতে তিনটি এবং রাবার, লেদার অ্যান্ড অ্যালাইড খাতে চারটি প্লট বরাদ্দ দিয়েছে। সম্প্রতি সরজমিনে মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীতে গিয়ে দেখা যায়, বরাদ্দকৃত ৮৮টি প্লটের মধ্যে ৫৯টি এখনো খালি পড়ে রয়েছে। এছাড়া লোকসানের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে কার্টন উৎপাদনকারী খান অ্যাকসেসরিজ। কারখানাটির সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক বৃদ্ধ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘লোকসানের কারণে প্রায় চার বছর আগে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়।
মিরসরাই বিসিক শিল্পনগরীতে বর্তমানে উৎপাদনে থাকা আটটি কারখানা হলো এয়াকুব অটো রাইস মিল, খাজা ভান্ডার, খান অ্যাকসেসরিজ, নাছির কেমিক্যাল, আলিফ ফুড, মেঘনা ডাল মিল, ইনোভা টেক্সটাইল ও এবি কমোডিটিজ। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৫৫ জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। তবে ইনোভা টেক্সটাইল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে আরও কয়েকশ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে; বর্তমানে সেখানে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। বিসিক চট্টগ্রামের শিল্পনগরী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তানজিলুর রহমান জানান, ৮০টি শিল্প-কারখানার বিপরীতে বর্তমানে রয়েছে মাত্র ১১টি, যার মধ্যে উৎপাদনে আছে আটটি। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারছে না। বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া ছোট কারখানা চালানো প্রায় অসম্ভব। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর মিরসরাই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে বিসিকের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
