খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা

দেশের ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন খেলাপি। খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায়। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যার ৩৫.৭৩ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বুধবার এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে। কিছুদিন পর বরং খেলাপি ঋণের হার আরও বাড়বে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠিত হওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের হিসাব ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে, অর্থাৎ প্রতি তিন মাসে প্রকাশ করে থাকে। গত জুন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। এরপর তিন মাসে এটি বেড়ে ৩৬ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা হয়েছে। ব্যাংকারদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতি এত বেশি মাত্রায় ঘটেছে যে খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ আরও অনেক কর্পোরেট গ্রুপ এবং বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪১.১ শতাংশ। যদিও ২০১১ সালে এটি কমে ৬.১ শতাংশে নেমে আসে, বড় বড় কেলেঙ্কারির কারণে পরবর্তীতে আবারও বৃদ্ধি পেতে থাকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর একটা অপপ্রয়াস ছিল। তথ্য বিকৃত করে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা আমরা দেখেছি। সঠিকভাবে হিসাব করায় সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি হার প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে। এটা অবিশ্বাস্য হলেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিছুদিনের মধ্যে এ হার বরং ৪০ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে।’ করণীয় জানতে চাইলে মইনুল ইসলাম বলেন, ‘বহু বছর ধরে আমি একটা কথা বলে আসছি, আবার বলছি, প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপির জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল করতে হবে। নইলে এ থেকে আমরা মুক্তি পাব না।’

যেসব ব্যাংক বেশি দায়ী

কম-বেশি সব ব্যাংকেই খেলাপি গ্রাহক থাকে। তবে বিদেশি ব্যাংকে খেলাপি কম এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে বেশি। জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে মোট খেলাপি বৃদ্ধিতে একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংকের দায়ও কম নয়। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত হতে যাচ্ছে। এই পাঁচ ব্যাংকের প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে দেড় লাখ কোটি টাকা খেলাপি। এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটি ব্যাংক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই গ্রুপ এসব ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেছে, যা বর্তমানে খেলাপি হিসেবে ধরা পড়েছে।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, দুই লাখ থেকে চার লাখ কোটি, চার লাখ থেকে ছয় লাখ কোটি আর এখন সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে খেলাপি ঋণ। ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশের পরিবর্তে বরং গোপন করেছে এবং তথ্য-উপাত্ত জালিয়াতি করে দেখিয়েছে মুনাফা। সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, বিষয়টি আর কিছুই নয়, আগের সরকারের আমলের অনিয়ম-দুর্নীতির ফল। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বলে দিয়েছে, খেলাপি ঋণের হিসাব হবে স্বচ্ছ এবং তথ্য-উপাত্তের জালিয়াতি আর করা যাবে না। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়লেও সত্য তথ্য উঠে আসছে—এটাই হচ্ছে ইতিবাচক দিক।

** আরও ১.৫ লাখ কোটি টাকা বাড়বে খেলাপি ঋণ
** তিন মাসে খেলাপি ঋণ বাড়ল ৭৪,৫৭০ কোটি টাকা
** খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা
** ১১ গ্রুপের ঋণ খেলাপি আড়াই লাখ কোটি টাকা
** ৬০০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন