খেলাপি ঋণ না কমলে মালিকানা হারাবেন ব্যাংক পরিচালক

খেলাপি ঋণের হারে বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছর শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নিয়েছে। আগামী বছর শেষে তা ১০ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রথম ধাপে সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন শিথিলতার মাধ্যমে ঋণ আদায়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে ধাপে ধাপে কঠোর অবস্থানে যাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে ব্যাংকের পরিচালকরা মালিকানা হারাতে পারেন। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে রেজল্যুশনের আওতায় এনে বিক্রি, একীভূতকরণ বা অবসায়নের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে মোট ২১টি কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা হয়েছে। এসব নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক বৈঠক করেছেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। সিদ্ধান্ত হয়েছে, নতুন করে ঋণ পুনঃতপশিলে আর বিশেষ কোনো নীতিমালা হবে না। গত ২৯ জুন জারি করা ‘এক্সিট পলিসি’-এর আওতায় অন্তত মূল ঋণ আদায় করতে হবে। যে কারণে আয় খাতে নেওয়া সুদ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে।

চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত শিথিল নীতিতে ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকলেও আগামী বছর থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে; এর মধ্যে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন, অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান যুক্ত করা এবং অনাদায়ী খেলাপিদের নাম-ছবিসহ তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ রয়েছে, যা বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ও ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখায় টানানো হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত খেলাপি ঋণের ভিত্তিতে প্রভিশন ঘাটতি নির্ধারণ করে তা পূরণ ও প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণের জন্য ব্যাংক পরিচালনায় যুক্তদের নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে; এই সময়ের মধ্যে মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে পরিচালকরা মালিকানা হারাবেন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর কোনো ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার অযোগ্য থাকবেন।

২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ১২ বছরে বিশেষ সুবিধায় মোট ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়েছে; এর সঙ্গে গত বছর যুক্ত হয়েছে আরও ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। তবে পুনঃতপশিলের পরও অনাদায়ী ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা, যা ইঙ্গিত দেয় যে এসব ঋণের প্রকৃত আদায় খুবই সীমিত। এ বাস্তবতায় খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ দেখানো হলেও, বাস্তবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ গত বছর শেষে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংক খাতের মূলধন নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে, যেখানে ২০টি ব্যাংকের ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি বড় ভূমিকা রেখেছে। দেশের ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে গত বছর মাত্র ১৭টি মুনাফা করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, খেলাপি ঋণ কমানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন নীতি নেওয়া হচ্ছে; শুরুতে নমনীয়তা থাকলেও ঋণ পরিশোধ না করলে খেলাপি গ্রাহকদের পরবর্তীতে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় ধাপে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনে গঠিত কোম্পানির কাছে খেলাপি গ্রহীতার বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হবে। তবে এই সম্পদ বিক্রির মানে ঋণখেলাপি দায়মুক্তি পাবেন তেমন না। কেবল আদায়ের সমপরিমাণ দায়মুক্তি মিলবে। উদাহরণস্বরূপ, সুদসহ কোনো খেলাপির কাছে ব্যাংকের পাওনা এক হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়ন এবং তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নে হয়তো বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য নির্ধারিত হলো ১২০ কোটি টাকা। ওই কোম্পানি সম্পদ উদ্ধার, রক্ষণাবেক্ষণ ও মুনাফা হিসাব করে তা ১০০ কোটি টাকায় কিনে নিল। এখন বাকি ৯০০ কোটি টাকার জন্য ওই ঋণ গ্রহীতা ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এক্সিট সুবিধা নিয়ে কেউ কেউ সমালোচনা করছে। তবে বছরের পর বছর ঋণ টেনে নেওয়ার চেয়ে নিষ্পত্তি করতে পারলে অনেক ভালো। ১০ বছর টানার পর ১০০ টাকা আদায়ের চেয়ে এখন ২০ টাকা ছাড় দিয়ে ৮০ টাকা আদায় করতে পারলে অনেক ভালো। তবে কোনোভাবে যেন এর অপব্যবহার না হয়। মাহবুবুর রহমান বলেন, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কেনার বিষয়টি কতটুকু কার্যকর হবে, তা দেখার বিষয়। কেননা, এখানে ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া জামানত বা বেশি দর দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছে। ফলে বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য আগে বের করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় এক্সিটসহ ছয়টি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে– খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের ব্যাংকের জন্য আগাম সতর্কতা হিসেবে ২০২২ সালে প্রণীত প্রম্পট কারেকটিভ অ্যাকশন (পিসিএ) কাঠামো বাস্তবায়ন হবে। এ কাঠামোর আওতায় আওয়ামী লীগের সময়ে পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। পরবর্তী সময় ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের আওতায় অন্তর্বর্তী সরকার শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করেছে।