দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ব্যাংকগুলো। এর অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার (১২ নভেম্বর) তফসিলি ব্যাংকের নির্বাহী প্রধানেরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বড় খেলাপিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি বকেয়া আদায়ে আদালতে মামলা করার সময় এককালীন ডাউন পেমেন্টের পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
বেসামাল খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ে গৃহীত পদক্ষেপ সংক্রান্ত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. কবির আহম্মদ। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর প্রেসিডেন্ট এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন। তিনি জানান, সরকারের পরিবর্তনের পর খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপির হার ২৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং এক বছরে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা নতুন খেলাপি ঋণ যুক্ত হয়েছে। বৈঠকে এসব ঋণ আদায়ের উপায় নিয়ে এক্সক্লুসিভ আলোচনা হয়েছে। সেখানে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিদেশগমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়। এছাড়া উচ্চ আদালতে রিট করার ক্ষেত্রে নিয়মিত ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট বাড়িয়ে অর্ধেকের কাছাকাছি আনার প্রস্তাব এসেছে। বৈঠকে এ বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়, রিট শুনানির সময় ব্যাংকারদের পক্ষ হিসেবে মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে এবং আদালতে খেলাপিদের স্বার্থের পাশাপাশি আমানতকারীদের স্বার্থও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
মাসরুর আরেফিন বলেন, ঋণ আদায়ে ডিসেম্বরের মধ্যে দৃশ্যমান কিছু করতে চায় ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও সেই রকম অগ্রগতি দেখতে চান। কিন্তু কোন কৌশলে যেন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিচ্ছে না। সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাস্তব নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা। আর নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) ব্যাংকের আমানত ফেরত দিচ্ছে না। এনবিএফআইগুলো যাতে অর্থ ফেরত দেয়, সেই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
পতিত সরকারের আমলে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া নীতি সহায়তার বিষয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, নীতি সহায়তার পদক্ষেপ একেবারে কাজ করছে না। তারা সর্বনিম্ন ২৫ লাখ টাকার ডাউন পেমেন্টে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আবর গ্রাহকভেদে ১ শতাংশ বা ২ শতাংশ ডাইন পেমেন্ট নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এমন অবস্থায় খেলাপিরা নানা ভঙ্গিমায় নতুন ঋণ চাচ্ছে, যা ঋণ নীতিমালার কার্যক্রমের সঙ্গে যায় না। প্রতিষ্ঠানগুলোকে চলমান রাখার গৃহীত উদ্যোগ কিন্তু শুরুতে ভালো ছিল। অনেকে প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ঋণ গ্রহীতাদের সাড়া না মেলায় পুরো নীতি সহায়তা যেন হযবরল দশায় উপনীত হয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ার কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আনার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত আগস্টে দেশের বড় করপোরেট ঋণখেলাপিসহ প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে। এর আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে। সুবিধার শর্ত অনুযায়ী ডাউন পেমেন্ট মাত্র ১ শতাংশ থেকে শুরু হবে এবং কিস্তি পরিশোধ শুরু করার আগে সর্বাধিক তিন বছরের ছাড় মিলবে। তবে শর্তগুলো প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ সুবিধার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আবদুল মোনেম গ্রুপ, ড্যান্ডি ডাইং, তানাকা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, দেশবন্ধু গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপ, জিপিএইচ ইস্পাত, আনোয়ার গ্রুপ, শাদাব ফ্যাশন, অ্যাপেক্স উইভিং। উল্লেখ্য, ১,২৫০টি প্রতিষ্ঠান বিশেষ নীতি সহায়তার জন্য আবেদন করেছিল।

