জুলাই অভ্যুত্থানের পর নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতে অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশগুলো জারি করেছিল, সেগুলো আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। তবে যেসব অধ্যাদেশে সরকারের জবাবদিহি বাড়ানো হয়েছিল, সেগুলো বাতিল বা আপাতত সংসদে না তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনে, গত ১৩ মার্চ, উত্থাপন করা হয়। একই দিনে গঠিত ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে। কমিটির ১১ জন সদস্য বিএনপির এবং তিনজন জামায়াতের। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এসব অধ্যাদেশের বিষয়ে ৩০ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ১২ এপ্রিলের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সংসদে সুপারিশ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ৯৮টি অধ্যাদেশ বিল আকারে এনে আইনে পরিণত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে উপস্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, আর ২০টি অধ্যাদেশ আপাতত আইনে রূপান্তর না করার কথা বলা হয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এ সুপারিশে ভিন্নমত জানালেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সরকারি দল বিএনপি সহজেই এটি কার্যকর করতে পারবে। এর ফলে সরকারের ক্ষমতা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের মতামত রাখেনি
যেসব অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন করে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের বিধান, আন্দোলনে জড়িত সরকারি কর্মচারীদের ২৮ কার্যদিবসের মধ্যে বরখাস্ত করার ব্যবস্থা এবং কারণ দর্শানো ছাড়াই ওয়াসার কর্মচারীদের অপসারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা। অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত নিয়েছিল কমিটি। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় তাদের মতামতে উল্লেখ করে, ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ উল্লেখ করে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের বিধান বহাল থাকলে তা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এসব আশঙ্কা সত্ত্বেও বিএনপি সরকার কোনো সংশোধন ছাড়াই অধ্যাদেশ দুটিকে আইনে রূপান্তরের জন্য সংসদে উপস্থাপন করছে।
বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা থাকছে
সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ দেন। তবে ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে বাস্তবে উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাবই চূড়ান্ত হয়ে থাকে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ড. ইউনূস এই ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান। সেখানে বিধান করা হয়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তিনজন বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, একজন সাবেক বিচারপতি ও একজন অধ্যাপককে নিয়ে একটি কাউন্সিল গঠন করা হবে, যা বিচারপতি পদে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করবে। এরপর তাদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে, যা প্রধান বিচারপতির পরামর্শ হিসেবে গণ্য হবে। রাষ্ট্রপতি ওই কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগ দেবেন।
সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ সরকারপ্রধানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখতে জারি করা এসব বিধান সংবলিত অধ্যাদেশটি আইনের রূপান্তর করা হচ্ছে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতায়, আইন মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরি, বদলি পদোন্নতির নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতিকে দেওয়ার অধ্যাদেশও বাতিল হচ্ছে। ফলে বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা থাকছে।
জবাবদিহির অধ্যাদেশ আইন হচ্ছে না
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশও আইনে রূপান্তর করা হবে না। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে সরকারের আপত্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্ব অনুমতি নিতে হবে। বিরোধী দল এতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। তারা বলেছেন, যে কারণেই কোনো সংস্থা, বাহিনী কাউকে আটক করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের সামনে উপস্থাপন না করলে, তা সংবিধানের লঙ্ঘন।
বিশেষ কমিটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরে সংসদে উত্থাপনের সুপারিশ করেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশটি সম্পর্কে মতামতে বলেছে, ‘গুম একটি সংবেদনশীল অপরাধ। এর সঙ্গে সরকারের শৃঙ্খলা-বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায় সম্পৃক্ত’। তাই অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তর না করে সংশোধনসহ নতুন আইন করার মতামত দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ একজন গুমের শিকার ব্যক্তি। তিনি গুমের কারণে নিপীড়িত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর মন্ত্রলণালয় থেকে যে মতামত এসেছে, তা খুবই দুঃখজনক। সরকারি দল অধ্যাদেশটিকে সংসদে উপস্থাপনই করছে না। এতে আবার গুমের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এতে কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে গুম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তসহ ব্যাপক ক্ষমতা পেয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও সংস্থার নিয়ন্ত্রিত স্থান পরিদর্শন; নথি তলবের ক্ষমতাও পেয়েছিল কমিশন। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের নিয়োগ সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে সার্চ কমিটির বিধান করা হয়। সরকার চাইলেই যাতে সরিয়ে দিতে না পারে, সে জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ পদ্ধতিতে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে অপসারণের বিধান করা হয়েছিল।
নাগরিক সমাজ অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছিল। তবে সরকারি দলের বাতিলের তালিকায় রয়েছে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ। আইন ও সংসদ বিভাগের মতামতে বলা হয়েছে, ‘মানবাধিকার কমিশন কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমের মতো সংবেদনশীল অপরাধের তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এর সঙ্গে সরকারের শৃঙ্খলা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায় সম্পৃক্ত। তাই এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে অধিকতর পরামর্শ করা প্রয়োজন। অধ্যাদেশটি বাতিল করে পরে অধিকতর সংশোধনসহ আইন করা যেতে পারে।’ বিরোধী দল এতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে বলেছে, সরকার এমন কোনো কমিশন চায় না, যা সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করতে পারবে।
আট সদস্যের সার্চ কমিটির মাধ্যমে দুদকে নিয়োগ, তদন্ত ও অনুসন্ধান ক্ষমতা বৃদ্ধি, সরাসরি এজাহার দায়েরের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে। বিএনপি সরকার এই অধ্যাদেশটিও আইনে রূপান্তর করছে না। সরকারি মতামতে বলা হয়েছে, বাছাই কমিটিতে আরও সরকারি প্রতিনিধি যুক্ত করতে হবে। সরকারি দল কমিটিতে বলেছে, সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে চেয়ারম্যান ও কমিশনারের পাঁচটি পদে নিয়োগের জন্য ১০ জনের নাম পাঠাবে।
বিরোধী দল নোট অব ডিসেন্টে বলেছে, সার্চ কমিটির চারজন সরকারের প্রতিনিধি। আরও প্রতিনিধি বৃদ্ধি করা হলে সরকারের ইচ্ছায় নিয়োগে হবে। রাষ্ট্রপতিকে ১০টি নাম পাঠালে বাছাই অর্থহীন। সরকারি দল তথ্য অধিকার অধ্যাদেশও পাস করছে না। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্ত, আইজিপি নিয়োগে সুপারিশ করার ক্ষমতাসহ পুলিশ কমিশন গঠনে অধ্যাদেশ জারি করে। তবে বিএনপি অধ্যাদেশটি সংশোধন করছে। এতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিরোধী দল।
মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাদেশে বিরোধী দলের ভিন্নমত
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল অধ্যাদেশ পাস করতে যাচ্ছে সরকার। এতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টির নাম রয়েছে। এতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে জামায়াত বলেছে, এই দলগুলোকে পাকিস্তানের হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০২২ সালে শেখ হাসিনা এই বিধান করেছিলেন। ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন।
