** বন্ড সুবিধার কাপড় ও এক্সেসরিজ বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি
** লাইসেন্স বাঁচাতে প্রতিষ্ঠানের কথিত মালিক আফছার বিভিন্ন মাধ্যমে কন্ট্রাক্ট করছে বলে অভিযোগ রয়েছে
বন্ড সুবিধার কাপড় ডোর-টু-ডোর সার্ভিসে বিক্রি করে আসছে কেএলডি অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের একটি নামসর্বস গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান। ১৫০ টাকা কেজি হিসেবে এই ডোর-টু-ডোর সার্ভিসে বিক্রি করা হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি এলসি কন্ট্রাক্টে বন্ড সুবিধার কাপড় বিক্রি করে আসছে। বন্ড কমিশনারেটের পরিদর্শনে নামসর্বস প্রতিষ্ঠান ও বন্ড সুবিধার কাপড় বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে স্টক লটের পণ্যের কাগজ দিয়ে ভুয়া রপ্তানি দেখানোর প্রমাণও পেয়েছেন বন্ড কর্মকর্তারা। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিআইএন লক করতে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স স্থগিত ও বাতিল করার উদ্যোগ নিচ্ছে কমিশনারেট। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, ১২ জানুয়ারি বন্ড কমিশনারেট থেকে বিন লক করার বিষয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৩ মে বন্ড কমিশনারেটের ৯ সদস্যের প্রিভেন্টিভ টিম প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে নিবন্ধিত ঠিকানায় অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ওই ঠিকানায় রনি টেক্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়। ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করায় বন্ড প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে বিন লক করতে পরিদর্শন দলের কর্মকর্তারা সুপারিশ করেন। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা বন্ড সুবিধার কাপড় ও এক্সেসরিজ আমদানি স্থগিত করতেও সুপারিশ করা হয়। বন্ড কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির আমদানি-রপ্তানি যাচাই করে দেখতে পান, প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করা কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি না করে বিক্রি করে দিয়ে আসছে। যাতে ৪ কোটি ৮৫ লাখ ১৪ হাজার ৬৬ টাকা শুল্ককর ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়। এই শুল্ককর ফাঁকি ও প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিন লক এবং শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি বিন আনলক করতে উচ্চ আদালতে আবেদন করেন। আদালত তিনদিনের জন্য বিন আনলক করতে বন্ড কমিশনারেটকে নির্দেশ দেন। তবে বন্ড কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেএলডি সে সময় এলসি কন্ট্রাক্টে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে কাপড় ও এক্সেসরিজ বিক্রি করেছেন। সেই কাপড় খালাস করতে উচ্চ আদালতের শরাণাপন্ন হয়েছিলেন।

অপরদিকে, নামসর্বস প্রতিষ্ঠান। মাত্র সাত মাসে বন্ড সুবিধায় আমদানি করেছে প্রায় ৬৪ মেট্রিক টন কাপড়। যার মধ্যে এক কেজি কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করা হয়নি। সব বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ডোর-টু-ডোর সার্ভিসের মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা মূল্যের এই কাপড় বিক্রি করে দিয়েছে। যাতে শুল্ককর ফাঁকি হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও ফাঁকি দেওয়া শুল্ককর পরিশোধে কেএলডি অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের ওই প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ২১ জানুয়ারি এই নোটিশ জারি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালে বন্ড লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে অর্থাৎ প্রায় ১২ বছরে ধরে প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাপড় ও এক্সেসরিজ খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছে। শুধু ডোর-টু-ডোর সার্ভিস নয়, প্রতিষ্ঠানটি কন্ট্রাক্টে এলসি বিক্রির মাধ্যমে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে আসছে। এছাড়া স্টক লটের পণ্যকে রপ্তানি হিসেবে দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। বিজনেস বার্তা ৭ জানুয়ারি এই নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ৮ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একটি প্রিভেন্টিভ টিম কেএলডি নামক সেই নামসর্বস প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করেন। যাতে ডোর-টু-ডোর সার্ভিস, এলসি কন্ট্রাক্ট ও ভুয়া রপ্তানির প্রমাণ পায়।
অপরদিকে, বন্ড কমিশনারেটের নোটিশে বলা হয়েছে, প্রিভেন্টিভ টিমের সদস্যরা কেএলডি অ্যাপারেলস লিমিটেডের ওয়্যারহাউসে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কোনো কাপড় ও এক্সেসরিজ পায়নি। ওয়্যারহাউসে কেবলমাত্র ১৭ হাজার ৪৮৮ পিস ডেনিম প্যান্ট পেয়েছে, অথচ এই ডেনিমের কাপড় প্রতিষ্ঠান আমদানি করেনি। এমআইএস থেকে কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের ৫ জুন থেকে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত (প্রায় সাত মাস) আমদানির তথ্য যাচাই করেন। যাতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি সাত মাসে ৬৪ হাজার ৮০৪ কেজি বা প্রায় ৬৪ মেট্রিক টন কাপড় ও এক্সেসরিজ আমদানি করেছে। যার মধ্যে ৬৮৮ কেজি ফেব্রিক্সস, ২ হাজার ৩২৪ কেজি ওভেন ফেব্রিক্সস, ৩৭ হাজার ৫৭৯ কেজি পলিস্টার ফেব্রিক্সস, ২৪২ কেজি কটন ফেব্রিক্সস, ২৩ হাজার কেজি ড্রাই টেক্স ওভেন ফেব্রিক্সস। এছাড়া ৫ কেজি র্যাপিড ট্যাগ, ৯৬৭ কেজি লেইস। আমদানি করে ডোর-টু-ডোর সার্ভিসে বিক্রি করে দেওয়া এই কাপড়ের আরোপিত শুল্ককর প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, যা প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দিয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউস বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের নিকট এই শুল্ককর আদায়যোগ্য। জবাব দিতে প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ৭ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৪ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ ৭৯ হাজার ১৯৪ কেজি বা ১৭৯ মেট্রিক টন কাপড় ও এক্সেসরিজ আমদানি করেছে, যা সরাসরি বিক্রি করে দিয়েছে। যাতে প্রায় ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা শুল্ককর ফাঁকির বিষয়ে বন্ড কমিশনারেট কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদ আফছার আলী নামে কেএলডি অ্যাপারেলস লিমিটেডের একজন কর্মাশিয়াল রয়েছে, যিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক পরিচয় দেন। এই আফছার ডোর-টু-ডোর সার্ভিসে কাপড় ও এক্সেসরিজ বিক্রি, কন্ট্রাক্টে এলসি বিক্রি ও ভুয়া রপ্তানি দেখানোর কারিগর। এই আফছারের সহযোগিতা ও আফছারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধার কাপড় এভাবে খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা ফাঁকি দিয়ে আসছে। আর কাস্টমস, সিঅ্যান্ডএফ, বন্দর ও বন্ড কমিশনারেটে ঘুষের কন্ট্রাক্ট করে আফছার দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের অপব্যবহার করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
** বন্ডের কাপড় ‘ডোর-টু-ডোর সার্ভিস’ ও এলসি বিক্রি করে কেএলডি
** ডোর-টু-ডোরে ৬৪ টন কাপড় বিক্রি করেছে ‘কেএলডি’
** ভুয়া রপ্তানি ও বন্ডের কাপড় ডোর-টু-ডোরে বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে
