কৃষি জমিতে আধুনিক সেচ ব্যবস্থা

নাটোরের বড়াইগ্রামে প্রথমবারের মতো আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেমের সফল যাত্রা শুরু হয়েছে। যুগ যুগ ধরে কৃষকরা মাটির নিচের পাইপের মাধ্যমে জমিতে পানি সেচ দিতেন, কিন্তু এবার পাইপের সঙ্গে সংযুক্ত স্প্রিংকলারের মাধ্যমে উপরের দিক থেকে বৃষ্টির মতো সেচ দেওয়া হবে। অস্ট্রিয়ার কারিগরি সহায়তা এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর পানাসি প্রকল্পের আর্থিক সহযোগিতায় বড়াইগ্রামের ভবানীপুরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ইক্ষু খামারে এই অত্যাধুনিক সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলক সেচ প্রদানের পর আনুষ্ঠানিকভাবে খামার কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর করা হবে।

২ জানুয়ারি নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আওতাভুক্ত ভবানীপুর ও মুলাডুলি কৃষি খামারে এ পদ্ধতি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। পাবনা-নাটোর-সিরাজগঞ্জ জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি প্রকল্পে মোট ৩ কোটি ৯৮ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে অস্ট্রিয়ার বায়ার কোম্পানির সহযোগিতায় এই পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শেরপা পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পে চীনের জ্যাক এবং ভিয়েতনামের খোয়া নামে দুজন বিশেষজ্ঞ প্রযুক্তিগত তত্ত্বাবধান ও প্রশিক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন। দুটি প্রকল্পের মধ্যে বড়াইগ্রামে কাজ ইতিমধ্যে শেষ হলেও ঈশ্বরদীর মুলাডুলি ইক্ষু খামারে কাজ এখনও চলমান। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি প্রকল্পে একসঙ্গে ১২৫ একর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। বড় আকারের কৃষিজমিতে কম সময় ও কম পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া এ আধুনিক পদ্ধতি দেশের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার আশা জাগাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সজীব আল মারুফ বলেন, সুগার মিলের কৃষি খামারে আধুনিক সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। সনাতন পদ্ধতিতে কৃষকরা মাঠে যে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দেন, তাতে জমির প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পানি দেওয়া হয়। এতে পানির অপচয় হয়। তিনি বলেন, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেচ দিলে কম খরচে স্বল্প সময়ে একসঙ্গে অনেক জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব। এতে পানির অপচয়ও কম হবে। সারা বছর পানি পাওয়া যাবে। এটি কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) নাটোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দেশে প্রথম নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আওতাধীন বড়াইগ্রামের ভবানীপুর কৃষি খামারে সেন্টার পিভোট ইরিগেশন সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এখানে এক কোটি ৯৮ লাখ পাঁচ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হয়েছে। পানি সাশ্রয়ী সবচেয়ে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি এটি। এ পদ্ধতিতে কৃষক খুব অল্প খরচে সেচ সুবিধা পাবেন।

বিএডিসির পাবনা রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদ জানান, এ পদ্ধতিতে চাকার সাহায্যে বৃত্তাকারে জমিতে ঘুরে ঘুরে বৃষ্টির ফোঁটার মতো পানি সেচ দেওয়া হবে। এ সেচ যন্ত্রের মাধ্যমে উঁচু-নিচু জমিতে সমানভাবে পানি সরবরাহ করা যায়। ফলে ফসল উৎপাদন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ভবানীপুর খামারের ইনচার্জ মাহাবুব-উল ইসলাম বলেন, এ খামারে মোট ৭০১ একর জমি রয়েছে। তার মধ্যে এ প্রকল্পের আওতায় ১২৫ একর জমিতে সেচ দেওয়া হবে। আগে যেখানে সেচ দিতে দুদিন লাগত সেখানে এ পদ্ধতিতে কয়েক ঘণ্টায় কাজ শেষ করা যাবে। ফলে আগে প্রতি একরে গড়ে দুজন করে ১২৫ একর জমিতে ২৫০ জন শ্রমিক দিয়ে ৬০ থেকে ৬২ দিনে পানি সেচ দিতে হতো। বর্তমানে এ পদ্ধতিতে মাত্র ৬০ জন অপারেটর দিয়ে পাঁচ থেকে ছয় দিনে সমপরিমাণ জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব।