কীটনাশক কাঁচামালে শূন্য শুল্ক এখনও বাস্তবায়ন হয়নি

চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কৃষি খাতে ব্যবহৃত কীটনাশকের কাঁচামাল আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও এখনও তা কার্যকর হয়নি। অথচ দেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। এ নিয়ে আলোচনা করতে আগামীকাল সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি বৈঠক আহ্বান করেছে।

বৈঠকে কীটনাশক উৎপাদনে প্রয়োজনীয় এক্সিপিয়েন্ট বা সহায়ক উপাদানে আরোপিত শুল্ক ও কর যৌক্তিকীকরণ এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। এর আগে ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় বালাইনাশকের কাঁচামালে শুল্ক শূন্য করার অনুরোধ জানিয়ে রাজস্ব বোর্ডে চিঠি দিয়েছিল। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে একদিকে দেশীয় শিল্পের বিকাশে বাধা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একচেটিয়া বাজার দখল করছে।

বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, দেশে কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ধরে বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার এক লাখ টন বালাইনাশকের বাজার রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। আমদানিকারকদের সিন্ডিকেট ও অতিমুনাফা বন্ধ হলে সমপরিমাণ কীটনাশক সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকায় আমদানি সম্ভব হতো। সংগঠনটির দাবি, কাঁচামাল ও সহায়ক পণ্যে আরোপিত বাড়তি শুল্ক তুলে নিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হলে একই পরিমাণ বালাইনাশক মাত্র তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকায় কৃষকের হাতে পৌঁছানো সম্ভব। সংগঠনের সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বালাইনাশকের পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে হাতে গোনা কয়েকটি দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানি, যাদের হাতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এখন জিম্মি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে বালাইনাশক আমদানির জন্য নিবন্ধিত আমদানিকারক রয়েছেন ১ হাজার ৩৮০ জন। তবে এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত অর্থবছরে মাত্র ২১১ জন আমদানিকারক বাস্তবে পণ্য আমদানি করেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সক্রিয়ভাবে আমদানিতে অংশ না নিয়েও শত শত আমদানিকারক বিভিন্নভাবে বিদেশ থেকে আনা বালাইনাশক নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মোড়কে বাজারজাত করছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। মূলত বহুজাতিক ও স্থানীয় কয়েকটি কোম্পানি ফিনিশড পণ্য আমদানি করে আমদানি মূল্যের কয়েকগুণ বেশি দামে কৃষকের কাছে বিক্রি করছে একটি সিন্ডিকেট চক্র।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী পেস্টিসাইড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটি (পিটাক)। ২০১৪ সালের পর থেকে কমিটির সিদ্ধান্তে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য একের পর এক সুবিধা তৈরি হলেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পড়েছে নানা শর্ত ও জটিলতার মুখে। বর্তমানে ২২টি দেশীয় কোম্পানি কীটনাশক উৎপাদনে আগ্রহ দেখালেও নিয়মকানুনের বেড়াজালে তারা কার্যত কোণঠাসা হয়ে আছে। বিপরীতে মাত্র সাতটি বহুজাতিক কোম্পানি দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশীয় কোম্পানিগুলো সোর্স পরিবর্তনের অনুমতি না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না, অথচ একই নিয়মে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে কাঁচামাল সংগ্রহ করছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএসপিএস) নির্বাহী পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মিজানুর রহমান জানান, দেশে এখন পর্যন্ত ৮০০-র বেশি কীটপতঙ্গ, ৮৩০-র বেশি রোগজীবাণু এবং ১৭০ ধরনের আগাছা শনাক্ত হয়েছে। এসব বালাই দমন করতে পেস্টিসাইডের ব্যবহার অপরিহার্য হলেও তা যেন কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ থাকে, সেটি নিশ্চিত করা সমান জরুরি। তাঁর মতে, ফিনিশড পণ্যের পরিবর্তে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলে কৃষকের কাছে পেস্টিসাইডের দাম অন্তত ৫৫ শতাংশ কমে আসত। একইসঙ্গে দেশীয় শিল্প বিকাশ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতো।