কালো টাকার সুযোগ থাকলেও ট্যাক্স বাড়বে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, আসন্ন বাজেটে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা বাতিলের চেষ্টা করা হবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে না পারলে ট্যাক্স বাড়ানো হবে। শনিবার (২২ মার্চ) ঢাকার পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য দেশীয় রাজস্ব সংগ্রহ: বাংলাদেশের জন্য নীতি সংস্কার অগ্রাধিকার’-শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড) ও ইআরএফ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক আবু ইউসুফ। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন। সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ এর প্রেসিডেন্ট দোলত আক্তার মালা।

কর্মশালায় একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, এনবিআর কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পুরোপুরি বাতিল করেনি। বিশেষ করে আবাসন খাতে এখনো সুযোগ রয়েছে। আগামী বাজেটে এই সুযোগ বাতিল হবে কিনা? জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আবাসনের ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে রিহ্যাব সব সময় বলে এই সুযোগ রাখার। না রাখলে তাদের ফ্ল্যাট, প্লট বিক্রি ও এই খাতে বিনিয়োগ কমে যাবে। আমরা চেষ্টা করবো বাতিল করতে। তবে, যদি আমরা এটি পুরোপুরি বাতিল করতে ব্যর্থ হই, তাহলে অন্তত ট্যাক্সের হার বৃদ্ধি করে আদর্শ করহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করবো।

উল্লেখ্য, এনবিআর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ, নগদ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, আর্থিক স্কিম ও ইনস্ট্রুমেন্ট, সব ধরনের ডিপোজিট বা সেভিং ডিপোজিটের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল করে দিয়েছে। কিন্তু বাজেটের সময় ঘোষিত আবাসন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিমাণে কর পরিশোধের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত পরিসম্পদ (কালো টাকা) প্রদর্শিত (সাদা) করা সংক্রান্ত বিধানটি বহাল রাখা হয়েছে। যেখানে এলাকাভেদে স্থাপনা, বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, ফ্লোর ষ্পেস ও ভূমিতে প্রতি বর্গমিটারের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণে কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শিত করার সুযোগ এখনো বহাল রয়েছে। তবে জমি ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রকৃত মূল্য বিবেচনায় এই হার আদর্শ করের চেয়ে কম।

অনুষ্ঠানে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন, আগামী বাজেট কেমন হতে পারে। জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, প্রকৃত অর্থে আগামী বাজেট হবে ব্যবসাবান্ধব ও জনকল্যাণমুখী। কিছুদিন ধরে এনবিআর যে কাজগুলো করেছে, এর মাধ্যমে বিষয়টি আপনারা টেরও পেয়েছেন। এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, এ বছর দুবার সয়াবিন তেলের শুল্ক কমানো হয়েছে; দুবার চিনির শুল্ক কমানো হয়েছে। এ ছাড়া খেজুর, ডাল, ডিম, চাল, পেঁয়াজ প্রভৃতি পণ্য আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছি। তার সুফলও পাওয়া গেছে। আবদুর রহমান খান বলেন, ‘এতে (শুল্কছাড়ের ফলে) আমরা কয়েক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। তবে আমরা সেগুলো চিন্তা করিনি। আমরা জনস্বার্থ চিন্তা করেছি।’

চেয়ারম্যান বলেন, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকা সত্ত্বেও যারা আয়কর রিটার্ন দেন না, তাদের নোটিশ দেওয়া শুরু হয়েছে। আমরা নোটিশ দেওয়া শুরু করেছি। এখন লোকজন হয়তো বলা শুরু করবে যে আমরা তো খুব ঝামেলায় আছি। এনবিআর চেয়ারম্যান আরও জানান, আগামী বাজেটে নতুন করে কোনো কর অব্যাহতি দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, আমরা চিন্তা করেছি, বিদ্যমান কর অব্যাহতিও কমাব, উঠিয়ে দেব এবং যারা কম হারে দেয়, তাদের বাড়িয়ে দেব। নতুন কোনো কর অব্যাহতি দেওয়া হবে না।

মূল প্রবন্ধে র্যােপিডের নির্বাহী পরিচালক আবু ইউসুফ বলেন, দেশের আর্থিক উন্নতি, পরনির্ভরশীলতা কমানো ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দেশের ভেতরে কর আহরণ বৃদ্ধি করা অত্যাবশ্যক; কিন্তু কর আহরণ ও কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে অবকাঠামো সমস্যার কারণে দেশের কর-জিডিপি হার এখনো অনেক কম। দেশে রাজস্ব-জিডিপির হার বেশ কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে উল্লেখ করে আবু ইউসুফ বলেন, গত বছর এটি আরও কমে ৮ শতাংশের নিচে নেমেছে। প্রত্যক্ষ কর আহরণ কম হওয়ায় রাজস্ব আহরণের জন্য সরকার ভ্যাট ও বাণিজ্যকেন্দ্রিক রাজস্ব আদায়ে বেশি নির্ভর করছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষদের প্রভাবিত করছে।