কালোটাকা সাদা: দুইজনকে রিটার্নে দেখাতে হবে

বাজেট ২০২৬-২৭

** মৌজা রেটের কয়েকগুণ বেশি দামে সম্পদ ক্রয়-বিক্রয় হয়, মৌজা রেটের বাড়তি টাকা রিটার্নে দেখাতে সমস্যা
** ক্রেতা-বিক্রেতা-দুইজন-ই মিথ্যা ঘোষণা দেয়, একটা রাষ্ট্র মিথ্যার উপর চলতে পারে না বলেছে এনবিআর
** অপ্রদর্শিত সেই টাকা রিটার্নে দেখাতে করদাতাকে নিয়মিত হারে সর্বোচ্চ কর দিতে হবে

আপনি ৫ কোটি টাকার একটি সম্পদ বিক্রি করলেন। ওই সম্পদের মৌজা রেট অনুযায়ী দলিল হলো ৫০ লাখ টাকা। আপনার কাছে ৫০ লাখ টাকা বৈধ দলিল বা প্রমাণপত্র রয়েছে। বাকি সাড়ে ৪ কোটি টাকার কোন বৈধ দলিল নেই। বৈধ দলিল বা প্রমাণপত্র না থাকায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা আপনি আয়কর রিটার্নে দেখাতে পারছেন না। এই সম্পদ বিক্রির টাকার বিষয়ে ক্রেতা, বিক্রেতা, দলিল লেখক, ভূমি অফিস-সবাই জানে। কিন্তু আপনাকে রিটার্নে দেখাতে হয় ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকাশ্য দিবালোকে সবাই জানলেও রাষ্ট্রীয় একটি ‘মিথ্যার’ উপর ভর করে আপনাকে রিটার্নে তথ্য দিতে হয়। এই সাড়ে ৪ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা হয়ে গেলো। শুধু বিক্রেতা নয়, ক্রেতার ক্ষেত্রেও একই বিপদ।

এনবিআর বলছে, দেশে সম্পদ বিশেষ করে জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক স্পেস ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার কোটি টাকা কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত আয় হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠিত এই মিথ্যাচারের কারণে সরকার এই টাকা থেকে রাজস্ব পায় না। তবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর বাজেটে শর্ত সাপেক্ষে এই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। শর্তের মধ্যে রয়েছে- বিনিয়োগ করা এবং ক্রেতা-বিক্রেতা-দুইজনের আয়কর রিটার্নে সম্পদ বিক্রির সঠিক মূল্য ঘোষণা করতে হবে, যেখানে সর্বোচ্চ হারে কর পরিশোধ করতে হবে। তবে, দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আয়কর বিভাগের বাজেট সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আমরা কালোটাকা বলবো না। সিস্টেমের কারণে এই টাকা ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ দেখাতে পারেন না। মূল কারণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক মিথ্যাচার বা মিথ্যা ঘোষণা। এই সিস্টেম থেকে হতে বের হতে শর্ত সাপেক্ষে আগামী সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে ক্রেতা ও বিক্রেতা-দুইজনকে রিটার্নে দেখাতে হবে। আর করদাতা স্বাভাবিক নিয়মে সর্বোচ্চ হারে কর দেবেন। তবে কোন করদাতা এই সুবিধার অপব্যবহার করা চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থার মতে, দেশে মোট অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বা অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকা। তবে স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ে ২১ বারের বেশি সুযোগ দিয়েও মোট কালো টাকার মাত্র ৫ শতাংশ ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা মূল অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি ও টিআইবি এবং বিভিন্ন আর্থিক জরিপ অনুযায়ী, দেশের আবাসন খাতের মোট বার্ষিক লেনদেনের একটি বড় অংশই বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অপ্রদর্শিত বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ফলেই রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে জমির দাম কৃত্রিমভাবে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বেশি বেড়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদ ও রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের আবাসন খাত মূলত অপ্রদর্শিত অর্থ লুকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় নিরাপদ আশ্রয়। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো-মৌজা হার ও প্রকৃত মূল্যের ব্যবধান। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারের নির্ধারিত জমির সর্বনিম্ন মূল্য বা মৌজা রেট এবং প্রকৃত বাজারমূল্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। যেমন—গুলশান বা বনানীতে একটি ফ্ল্যাটের প্রকৃত বাজারমূল্য যদি ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা হয়, সরকারি রেজিস্ট্রেশন মূল্যে তা হয়তো ১ বা ২ কোটি টাকা দেখানো যায়। এই যে বাকি ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার লেনদেন, এটি সম্পূর্ণ নগদ বা অনানুষ্ঠানিক উপায়ে হয়, যা অর্থনীতিতে সরাসরি কালো টাকা হিসেবেই থেকে যায়। দ্বিতীয় কারণ হলো আইনি এক্সিট রুট। আয়কর আইনের বিশেষ ধারা অনুযায়ী, এলাকা এবং বর্গমিটার (স্কয়ার ফুট) প্রতি নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে ফ্ল্যাট বা জমি কেনার সুযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বহাল ছিল। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ঢালাও ১৫ শতাংশ করের বিশেষ ‘ট্যাক্স অ্যামনেস্টি’ সুবিধা বাতিল করেছে। তবে নিয়মিত কর এবং এলাকাভিত্তিক বর্গমিটার প্রতি কর পরিশোধ করে ফ্ল্যাট-জমি প্রদর্শনের আইনি পথ এখনো চালু রয়েছে।

এই বিষয়ে একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আগে কালোটাকা সাদা করার যে সুযোগ দেয়া হতো, তাতে ক্রেতাকে কোন প্রশ্ন করা হতো না। এখন যে সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তাতে ক্রেতা-বিক্রেতা-দুই পক্ষের সমাধান হলো। বিশেষ করে যিনি বিক্রেতা আছে, তার পক্ষে সমাধান হয়ে গেলো। আর এই সুযোগের পজেটিভ পার্ট হলো, এর মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতা সারাজীবনের জন্য ইনফারমাল হয়ে গেলো। যে বিক্রি করেছেন, তিনি তো রিটার্নে দেখাবে, যা তার একটা ক্যাশ ফ্লো হবে। এই টাকার যে ইনকাম হবে, তাও ইনফারমাল হয়ে গেলো। বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি হয়ত এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, ট্রেজারি বিল ইত্যাদি কিনছে-সেখানে যে ইনকাম হবে-তাও ইনফরমাল হয়ে গেলো। অর্থাৎ ক্রেতা-বিক্রেতা দুইজনের টাকা ইনফরমাল বা হোয়াইট হয়ে গেলো। এই পরিকল্পনা খুবই চমৎকার।’

অপরদিকে, কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান সম্প্রতি প্রাক-বজেট আলোচনায় স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বিশেষ কোনো ছাড় বা আলাদা স্কিম ছাড়াই যে কেউ চাইলে দেশের বিদ্যমান মার্জিনাল বা গড় করহার (রেগুলার রেট) পরিশোধ করে তার অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা আয়কর নথিতে প্রদর্শন (সাদা) করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বলতে চাই, বিদ্যমান করহার অনুযায়ী কর দিয়ে যে কেউ অপ্রদর্শিত অর্থ তার আয়কর নথিতে প্রদর্শন করতে পারেন। এতে আমরা বরং খুশিই হব।’ অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া ঢালাও বা বিশেষ সুবিধার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিগত ৫৪-৫৫ বছরে এ ধরনের অনেক বিশেষ স্কিম দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলো হিতে বিপরীত হয়েছে। কারণ, এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন। সারা বছর নিয়ম মেনে কর দেওয়া ব্যক্তিরা এটা ভালো চোখে দেখেন না।’

এনবিআর সূত্রমতে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সরকার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত সর্বমোট প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা সাদা বা বৈধ করা হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরে মাত্র ১০ শতাংশ কর এবং দায়মুক্তি দিয়ে ঢালাওভাবে এ সুবিধা দেয়। অর্থাৎ একজন স্বাভাবিক করদাতা যেখানে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর দিতে, আর কালোটাকার মালিককে সে সুযোগ দেওয়া হয় মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই সময় তীব্র সমালোচনা হয়। করোনা মহামারির সময়ে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকায় সে বছর দেশের ইতিহাসের একবছরে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাদা করেছিলেন। এই বিনিয়োগ থেকে এনবিআর দুই হাজার ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে।

হিসাব বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছর সুযোগ কিছুটা সীমিত করায় সাড়া বেশ কমে যায়। সে বছর মাত্র ২ হাজার ৩১১ জন করদাতা প্রায় ১ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা সাদা করেছেন। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছর) কড়া নজরদারির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল। সে সময় রেকর্ড ৩২ হাজার ৫৫৮ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ সরকারের (২০০৯-২০২৩) টানা তিন মেয়াদে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা সাদা করা হয়, যার বড় অংশই এসেছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর হারে এই সুবিধাটি আবারও চালু করা হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যায়ক্রমে এই সুবিধা, বিশেষ করে দায়মুক্তির বিধানটি প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমানে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে। তবে সেজন্য প্রযোজ্য হারে কর অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এবং প্রযোজ্য করের ওপর ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়। কিন্তু, দায়মুক্তি দেওয়া হলে কর কর্তৃপক্ষের বাইরে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের কোন সংস্থা ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে না।