** ২৪ ফ্যান উৎপাদনকারী কোম্পানি ৪৩২ বিল অব এন্ট্রিতে আমদানি করেছে টনে টনে মোটর, মোটর পার্টস
** ফ্যাক্টরি নির্মাণে ব্যবহারের শর্তে ৮১ কোটি রেয়াতি সুবিধায় আমদানি করা হয়েছে মোটর, মোটর পার্টস
** কোন প্রতিষ্ঠান ফ্যান বানিয়ে আবার কোন প্রতিষ্ঠান সরাসরি পার্টস বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে
ফ্যান কারখানা স্থাপনে লাগে মোটর আর মোটর পার্টস। তাও আবার একটি, দুইটি নয়-টনে টনে মোটর আর পার্টস! এই মোটর আর মোটর পার্টস আমদানি করা হয়েছে রেয়াতি সুবিধায়। শুল্কমুক্ত সুবিধার এই মটর আর মোটর পার্টস দিয়ে কোন কোন কোম্পানি ফ্যান তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেছে। আবার কোন কোন কোম্পানি সরাসরি মোটর আর মোটর পার্টস বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মূলত ফ্যান কারখানা স্থাপনে ব্যবহৃত মেশিনারিজ আর যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে সরকার এই রেয়াতি সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো সেই সুবিধার অপব্যবহার করে মেশিনারিজ আর যন্ত্রাংশের নামে টনে টনে মোটর আর মোটর পার্টস আমদানি করেছে। কারখানা স্থাপনের নামে মোটর আর মোটর পার্টস আমদানিতে ২৪টি কোম্পানি প্রায় শত কোটি টাকার রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার করেছে। কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনোরেটের তদন্তে বিষয়টি উঠে এসেছে। রেয়াতি সুবিধার শর্ত ভঙ্গ করায় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে পরিহার করা রাজস্ব আদায়ে চারটি কাস্টম হাউসকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, এক সময় ইলেকট্রিক ফ্যান ছিলো আমদানি নির্ভর। কিন্তু বর্তমানে দেশের কারখানাগুলো ফ্যান উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। চাহিদা বিবেচনায় শতাধিক ছোট-বড় কোম্পানি স্থানীয়ভাবে উন্নতমানের ফ্যান তৈরি হচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ফ্যান বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ফ্যানের চাহিদা ও বাজার দুটিই বাড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ফ্যানের বাজার। চাহিদা বিবেচনায় দেশের বড় কোম্পানিগুলো ফ্যান কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করছে। আর ফ্যান খাতকে সহযোগিতা করতে সরকার রেয়াতি সুবিধা দিয়েছে। বিশেষ করে কারখানা স্থাপনে আমদানি করা মেশিনারি, প্লান্ট, যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ আমদানিতে শর্ত সাপেক্ষে রেয়াতি সুবিধা দিয়েছে। রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার করা মোটর ও মোটর পার্টসে প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ২৬ দশমিক ২০ শতাংশ। যার মধ্যে কাস্টমস ডিউটি ১ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম কর ৫ শতাংশ, আগাম কর ৫ শতাংশ।
এনবিআর সূত্রমতে, ফ্যান খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে কারখানা স্থাপনে মেশিনারি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শর্ত সাপেক্ষে এই রেয়াতি সুবিধা দেয়া হয়। এই রেয়াতি সুবিধা দিতে ২০২০ ও ২০২১ সালে দুইটি আদেশ (এসআরও) জারি করে এনবিআর। দুইটি আদেশে দুইটি শর্ত দেয়া হয়। শর্তে বলা হয়, আমদানি করা মেশিনারি, প্লান্ট, যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য অংশ সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। এবং আমদানি করা এসব পণ্য খালাসের পর অন্য কোনো কাজে ব্যবহার বা হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তন করা যাবে না। করা হলে স্বাভাবিক হারে শুল্ককর পরিশোধ করতে হবে। পণ্য খালাসের সময় আমদানিকারক স্ট্যাম্পে কাস্টম কমিশনারের অঙ্গীকারনামা জমা দেবেন। আমদানি করা মেশিনারি ও যন্ত্রাংশ দিয়ে নতুন পণ্য উৎপাদন এবং তা বাজারে বিক্রি করা হলে রেয়াতি সুবিধা প্রযোজ্য হবে না বলে দুইটি আদেশে শর্ত দেয়া হয়েছে।
তবে ফ্যান কোম্পানিগুলো কারখানা স্থাপনে মেশিনারি ও যন্ত্রাংশের নামে টনে টনে মোটর ও মোটর পার্টস আমদানি করে আসছে। এবং এসব মোটর আর মোটর পার্টস কখনো ফ্যান তৈরি করে আবার কখনো সরাসরি বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয় কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেট। তাদের তদন্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম উঠে আসে। পরে এনবিআর ও চারটি কাস্টম হাউসকে প্রতিবেদন দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চারটি কাস্টম হাউস দিয়ে ২৪টি ফ্যান উৎপাদনকারী কোম্পানি রেয়াতি বা শুল্ককর সুবিধায় ‘পার্টস অব ইলেকট্রিক মোটর: রোটর; পার্টস অব ইলেটট্রিক মোটর: স্টাটর; পার্টস অব ইলেকট্রিক মোটর: স্টাটর এন্ড রোটর সেট; পার্টস অব ইলেকট্রিক মোটর: স্টাটর বা আর্মেচার এন্ড রোটর সেট’ ইত্যাদি পণ্য আমদানি করেছে। কোম্পানিগুলো রেয়াতি সুবিধায় মূলত এসব মোটর ও মোটর পার্টস আমদানি করেছে। এই ২৪টি কোম্পানি ৪৩২টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে প্রায় ৮১ কোটি টাকা শুল্ককর সুবিধা নিয়েছে বলে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে ১৪টি কোম্পানি ১৬০টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করে ২৭ কোটি ৪৬ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫৮ টাকা শুল্ককর সুবিধা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে এয়ারমেট গুডি ইলেকট্রিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ৩০টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ৩ কোটি ৫১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ টাকা; গোল্ডেন সন লিমিটেডের কোম্পানি গোল্ডেন ইনফিনিটি লিমিটেডের ১০টি বিল অব এন্ট্রিতে ২ কোটি ২৪ লাখ ৩ হাজার ৩০৩ টাকা ও পাঁচটি বিল অব এন্ট্রিতে এক কোটি ৩৭ লাখ ৮২ হাজার ২৬৫ টাকা; পদ্মা সেফটি প্রোডাক্টস চারটি বিল অব এন্ট্রিতে ৫৩ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ টাকা; মাই ট্রেড করপোরেশন ২৪টি বিল অব এন্ট্রিতে দুই কোটি ৫৪ লাখ ৭২ হাজার ৬৮ টাকা; সুমেটালস লিমিটেড (হিমেল ফ্যান) ১০টি বিল অব এন্ট্রিতে ৯৮ লাখ ৩৯ হাজার ৭২১ টাকা; শরিফ হোম অ্যাপ্লায়েন্স লিমিটেড দুইটি বিল অব এন্ট্রিতে ৬১ লাখ ১৪ হাজার ২২৯ টাকা; রুজা হাই-টেক লিমিটেড দুইটি বিল অব এন্ট্রিতে ৪০ লাখ ৭৯ হাজার ২৭৮ টাকা; ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি ৫৬টি বিল অব এন্ট্রিতে ৮ কোটি ৭৩ লাখ ৬২ হাজার ১০৯ টাকা। জে এ ম্যানুফ্যাকচারিং দুইটি বিল অব এন্ট্রিতে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৪৭৫ টাকা; জামান গ্রুপের জামান ম্যানুফ্যাকচারিং কোং লিমিটেড দুইটি বিল অব এন্ট্রিতে ২৪ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫৮ টাকা; জেআইএ এমইআই ইন্ডাস্ট্রিজ (বিডি) লিমিটেড একটি বিল অব এন্ট্রিতে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৪ টাকা; সুপার স্টার গ্রুপের সুপার স্টার ফ্যান লিমিটেড ১৭টি বিল অব এন্ট্রিতে ৫ কোটি ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৭৬ টাকা; এনসভের পাঁচটি বিল অব এন্ট্রিতে ৮৬ লাখ ৪৩ হাজার ৬৩২ টাকা।
অপরদিকে, পানগাঁও কাস্টম হাউস দিয়ে মেসার্স কে এল ইন্ডাস্ট্রিজ চারটি বিল অব এন্ট্রিতে ৫৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯ টাকা শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানি করেছে। আইসিডি কাস্টম হাউস দিয়ে ১০ কোম্পানি ২১৬টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ৩৭ কোটি ৩০ লাখ ৩৭ হাজার ১৮৬ টাকা শুল্কমুক্ত সুবিধার পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হুদা (চায়না) টেকনোলজি কোম্পানি দুইটি বিল অব এন্ট্রিতে ২৭ লাখ ৩৩ হাজার ৮৯১ টাকা; মেসার্স এইচ এম ইন্ডাস্টিজ দুইটি বিল অব এন্ট্রিতে ৩০ লাখ ৯১ হাজার ৩৪৯ টাকা; মাইশা ইলেকট্রনিকস ইন্ডাস্ট্রিজ ছয়টি বিল অব এন্ট্রিতে ৯০ লাখ ৫২ হাজার ৫২১ টাকা; কে টি এম ইলেকট্রিক এন্ড ইলেকট্রনিকস ১১টি বিল অব এন্ট্রিতে এক কোটি ৬৫ লাখ দুই হাজার ৪৫৫ টাকা; ভূঁইয়া ইলেকট্রিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১২টি বিল অব এন্ট্রিতে এক কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫০ টাকা; মেসার্স ওয়ালটার ১৪টি বিল অব এন্ট্রিতে ৬২ লাখ ৬১ হাজার ২৭ টাকা; নাভেদ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস ১১টি বিল অব এন্ট্রিতে দুই কোটি ৯ লাখ ৪৮ হাজার ১০০ টাকা; উইনস্টার ইমপেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ২৪টি বিল অব এন্ট্রিতে দুই কোটি ৮৬ লাখ ৬৯ হাজার ৭৭৯ টাকা; নিজাম ইলেকট্রিক ইন্ডাস্ট্রি ৪০টি বিল অব এন্ট্রিতে সাত কোটি ৮৫ লাখ ৮৮ হাজার ৪৯৭ টাকা; নোহা ফ্যান মটর ইন্ডাস্ট্রিজ ৪৮টি বিল অব এন্ট্রিতে ১১ কোটি ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ১৫৪ টাকা; ইমপ্রেস মটর এন্ড ফ্যান ইন্ডাস্ট্রিজ ৩০টি বিল অব এন্ট্রিতে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ ১০ হাজার ৮৮৫ টাকা; এনসভের আটটি বিল অব এন্ট্রিতে এক কোটি ১২ লাখ ১৯ হাজার ১৯৯ টাকা; মেসার্স কে এল ইন্ডাস্ট্রিজ চারটি বিল অব এন্ট্রিতে ৫৯ লাখ ৭১ হাজার ৬৭০ টাকা শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানি করেছে। অপরদিকে, মোংলা কাস্টম হাউস দিয়ে জেআইএ এমইআই ইন্ডাস্ট্রিজ (বিডি) লিমিটেড ৪৬টি বিল অব এন্ট্রিতে ১৬ কোটি ১৪ লাখ ৯৯ হাজার ৬১২ টাকার শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানি করেছে।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজনেস বার্তাকে বলেন, কারখানা স্থাপনে মোটর আর মোটর পার্টস তো লাগে না। কিন্তু কোম্পানিগুলো টনে টনে মোটর আর মোটর পার্টস আমদানি করেছে। কাস্টমস মূল্যায়ন প্রতিবেদন দিয়েছে। যাতে দেখা গেছে, প্রতিটি কোম্পানি কোন বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে কত পণ্য আমদানি করেছে কি পরিমাণ রেয়াতি সুবিধা নিয়েছে। কাস্টম হাউস প্রতিষ্ঠানগুলোকে শোকজ ও পরিহার করা শুল্ককর আদায় করবে। আর অপব্যবহার রোধে এনবিআর সিদ্ধান্ত নেবে।
অপরদিকে, রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার হয়নি বলে কোম্পানিগুলো দাবি করেছে। একাধিক ফ্যান উৎপাদনকারী কোম্পানির কর্মকর্তারা বিজনেস বার্তাকে জানিয়েছেন, কাস্টম হাউসের সঙ্গে ভুল বুঝাবুঝির কারণে শুল্ক মূল্যায়ন এই অযৌক্তিক দাবি তুলেছে। কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে কাস্টম হাউসের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিমা) সচিব রশিদ বিজনেস বার্তাকে বলেন, ফ্যানের বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে। বড় বড় কোম্পানি ফ্যান তৈরি করতেছে। তবে কারখানা তৈরির নামে আমদানি করা মোটর, মোটর পার্টস বাহিরে বিক্রি করা হয় কিনা আমার জানা নেই। রেয়াতি সুবিধা নিয়ে এনবিআরকে যে শুল্ক মূল্যায়ন থেকে প্রতিবেদন দিয়েছে তা কোন কোম্পানির পক্ষ থেকে সংগঠনকে জানানো হয়নি বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ছোট-বড় শতাধিক দেশি-বিদেশি কোম্পানি দেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফ্যান উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। বিআরবি, ভিশন, ক্লিক, ওয়ালটন, যমুনা, র্যাংগস, শরীফ, এনার্জিপ্যাক, প্যারাডাইস, সুপারস্টার, সুপারসাইন, গাজী ও ন্যাশনাল। এখন দেশি কোম্পানির ফ্যান স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিও হচ্ছে।
