কারখানার ছাদ থেকেই মিলতে পারে ১৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

দেশের তৈরি পোশাক কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৮ কোটি ৮২ লাখ ডলার বিনিয়োগ। এ খাতে চীনের সবুজ বিনিয়োগ বা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বৃহস্পতিবার সিপিডি ও বাংলাদেশ চীন রিনিউয়েবল এনার্জি ফোরামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ যোগান দেয় তৈরি পোশাক খাত। তবে সম্প্রতি তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এইচ অ্যান্ড এম, ইন্দিতেক্স, ওয়ালমার্ট ও গ্যাপের মতো বৈশ্বিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবহারে নতুন বাধ্যবাধকতা আরোপ করছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিএসডিডিডি আইন অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে কারখানাগুলোকে অন্তত ৩৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতায় পড়তে হবে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে থাকা পোশাক কারখানাগুলোর ওপর চালানো সমীক্ষায় দেখা গেছে, এখন কারখানাগুলতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের মাত্র ৩ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। অথচ এসব কারখানার ছাদ সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে সহজেই ১৪ শতাংশেরও বেশি বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কৃত্রিম উপগ্রহের ভৌগোলিক উপাত্ত ব্যবহার করে দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানা নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কারখানার মোট ৯৭ দশমিক ২৫ লাখ বর্গমিটার কার্যকর ছাদ রয়েছে। এসব ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে মোট ১ হাজার ৭৬৮ দশমিক ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশের সমান। গবেষণা অনুযায়ী, ছোট আকারের ২ হাজার ৪২০টি কারখানা থেকে ৪৮৪ দশমিক ৭ মেগাওয়াট, মাঝারি আকারের ৬৯৮টি কারখানা থেকে ৬৩৭ মেগাওয়াট এবং বড় আকারের ২০১টি কারখানা থেকে ৬৪৬ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হলে প্রতিটি কারখানা বছরে গড়ে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৩৩ থেকে ৪০ শতাংশ নিজস্ব উৎস থেকে মেটাতে পারবে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কম, যা প্রতি ইউনিটে মাত্র ৩ টাকা ৪ পয়সা।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, যেসব কারখানা এখনো সৌরবিদ্যুৎ চালু করেনি, এমন ২ হাজার ৩০৩টি কারখানায় সোলার প্যানেল বসাতে ১৮৮.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই বিনিয়োগ উপযোগিতার ভিত্তিতে কারখানাগুলোকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫০৯টি কারখানা সরাসরি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত এবং ১ হাজার ৩৫৯টি কারখানা নির্দিষ্ট অর্থায়ন সহায়তার মাধ্যমে বিনিয়োগযোগ্য হতে পারে। তবে কমার্শিয়াল ব্যাংকের সুদের হার ১০.৫ শতাংশের উপরে উঠলে অথবা কম সুদের গ্রিন রিফাইন্যান্সিং সুবিধা না থাকলে সরাসরি বিনিয়োগযোগ্য ক্যাটাগরি টিকে থাকে না।

গবেষণায় দেশীয় পোশাক শিল্পে হা-মীম গ্রুপের সফলতার উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, তারা ধাপে ধাপে বিভিন্ন ইউনিটে ২৯ মেগাওয়াটের বেশি সোলার প্যানেল স্থাপন করেছে। এর ফলে তাদের কালিয়াকৈর ও কালিগঞ্জের কারখানাগুলো সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুতে চলে এবং ডিজেলের ব্যবহার প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। তবে সামগ্রিক সৌরবিদ্যুৎ বিস্তারে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো ব্যাংক ঋণের শর্ত ও জামানত জটিলতার কারণে অর্থায়ন পাচ্ছে না। এছাড়া শ্রীডা থেকে সরঞ্জাম অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের হেলিকপ্টার উদ্ধারের বাহানায় অযৌক্তিকভাবে ২০ শতাংশ ছাদ খালি রাখার শর্ত এবং ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে বিলম্ব হওয়া ও শুল্কজনিত খরচের কারণে সৌর প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এসব সমস্যা নিরসনে শ্রীডার অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি চীনা গ্রিন ক্যাপিটাল ও স্থানীয় আইডিসিওএল-এর তহবিল মিলিয়ে যৌথ অর্থায়ন সুবিধা গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর মাধ্যমে ছোট কারখানাগুলোকে ক্লাস্টার আকারে সংগঠিত করে যৌথ বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।