কর প্রশাসনের পাঁচ দুর্বলতায় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত

করযোগ্য জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতির পরিধি বাড়লেও সেই অনুপাতে রাজস্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর পেছনে কর প্রশাসনের পাঁচটি মৌলিক দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে—করজাল সম্প্রসারণে ব্যর্থতা, কম হারে রিটার্ন দাখিল, দুর্বল নিরীক্ষা ব্যবস্থা, বকেয়া কর আদায়ে ধীরগতি এবং অকার্যকর কর রিফান্ড প্রক্রিয়া। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর প্রশাসন মূল্যায়ন সংস্থা ট্যাডাট। তাদের মতে, এসব সীমাবদ্ধতা দূর করা না গেলে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং টেকসই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

রাজস্ব খাত মূল্যায়নে ট্যাডাটের একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে বাংলাদেশ সফর করছে। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর, করদাতার তথ্যভাণ্ডারের মান উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

সূত্র জানায়, বৈঠকে কর প্রশাসনের বিভিন্ন সূচক, চলমান সংস্কার কার্যক্রম এবং ভবিষ্যতে রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নতুন করদাতা শনাক্তকরণ, করদাতার তথ্যভাণ্ডারের মানোন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ট্যাডাট। গত বছরের মূল্যায়নেও সংস্থাটি বাংলাদেশের কর প্রশাসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতির চিত্র তুলে ধরে, যেখানে করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন এবং রিটার্ন দাখিলের হারকে দুর্বল বলা হয়। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে রিটার্ন জমা দিয়েছেন ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার করদাতা। একইভাবে, প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার বিআইএনধারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মে মাস পর্যন্ত মাত্র ৩ লাখ ৪০ হাজার প্রতিষ্ঠান রিটার্ন দাখিল করেছে।

ট্যাডাটের মতে, করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনতে এনবিআরের একটি সুস্পষ্ট কৌশল প্রয়োজন। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য থাকলেও সেগুলোর সমন্বিত ব্যবহার এখনো কার্যকর হয়নি। ফলে অনেক সম্ভাব্য করদাতা করব্যবস্থার বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কম। অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে করদাতা ও রাজস্ব আদায় বাড়েনি। তাই টেকসইভাবে রাজস্ব বাড়াতে নতুন করদাতা শনাক্তে তথ্যনির্ভর এবং ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

ট্যাডাট আরও মনে করে, করদাতার তথ্যভাণ্ডারের মান উন্নয়ন এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক করদাতার তথ্য হালনাগাদ নয় এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঠিক চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া নিবন্ধন, তথ্য যাচাই, রিটার্ন দাখিল, নিরীক্ষা এবং কর আদায়ের পুরো প্রক্রিয়ায় এখনো পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সমন্বয় গড়ে ওঠেনি। এতে কর প্রশাসনের দক্ষতা কমছে এবং কর ফাঁকি বা কর পরিহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

ট্যাডাটের সুপারিশে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যবসা নিবন্ধন, ব্যাংকিং তথ্য, ভূমি রেকর্ড ও কোম্পানি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে সমন্বিত তথ্যবিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে নিরীক্ষা ও কর আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া অটোমেশনের আওতায় এনে ঝুঁকিভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কর ফাঁকি প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন) সৈয়দ মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, গত বছরের ট্যাডাট মূল্যায়নে চিহ্নিত দুর্বলতাগুলো দূর করতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সামনে আরও সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, কর রিফান্ড নিয়ে করদাতাদের যে অভিযোগ রয়েছে, তা সমাধানেও এনবিআর কাজ করে যাচ্ছে।

বর্তমানে সরকার কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করতে এনবিআরে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। বিশ্বব্যাংকের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (এসডিআরএমপি) এবং আইএমএফের সহায়তায় কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, তথ্য সমন্বয় ও সেবা আধুনিকায়নের কাজ চলছে। ট্যাডাটের সর্বশেষ মূল্যায়ন ও সুপারিশকে এসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।