কর কমলেও নিত্যপণ্যের বাজারে নেই স্বস্তি

নতুন বাজেটে মশলাসহ অর্ধশতাধিক নিত্যপণ্যের ওপর কর কমানো হলেও বাজারে তার তেমন কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। অধিকাংশ পণ্যের দাম আগের মতোই রয়েছে, বরং কিছু ক্ষেত্রে দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন শুল্ক সুবিধার আওতায় আমদানি করা মসলা বাজারে পৌঁছাতে আরও কিছু সময় লাগবে, ফলে এর সুফল পেতে ক্রেতাদের মধ্য জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট গত ১১ জুন উপস্থাপন করা হয়, যেখানে ৬৩টি নিত্যপণ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে এবং আমদানি করা সব ধরনের মসলার শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, যেসব পণ্যে কর কমানো হয়েছে, সেগুলোর দামও কমবে—এটাই সরকারের প্রত্যাশা।

৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর বাড়ানো হয়নি; বরং যেখানে ৫ শতাংশ কর ছিল, তা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমার কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার—মশলার সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার—ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাম এখনো চড়া রয়েছে, এমনকি কিছু মশলার দাম আরও বেড়েছে। বাজেট ঘোষণার আগে জিরা (আস্ত) প্রতি কেজি ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হলেও শুক্রবার তা বেড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে কাজুবাদাম প্রতি কেজি দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাসে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

লবঙ্গের দাম সামান্য বাড়লেও আগের দামে বিক্রি হচ্ছে এলাচ ও দারুচিনি। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি এলাচ ৪৪০০ থেকে সাড়ে ৫ হাজার ও দারুচিনি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। মৌলভীবাজারের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মোহন মোল্লা বলেন, আগের দামেই রয়েছে সবকিছু; উল্টা কিছু কিছু বেড়েছে। আগের মতোই লবঙ্গের কেজি দেড় হাজার টাকা, দারুচিনি ৫২০, জিরা ৬০০, গোলমরিচ ১ হাজার ৩০০ ও এলাচ সাড়ে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে খুচরা মশলা ব্যবসায়ী আতিউল আহসান ভাষ্য, ছোট দোকানে বেশির ভাগ মশলার দাম উল্টো বেড়ে গেছে। দারুচিনি, জয়ত্রী, পোস্তদানা, কাজুবাদাম—এসব পণ্য বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

তবে তার পাশের ‍মুদি দোকানদার মাহি স্টোরের মালিক মাহি বলেন, কিছু মশলা কমতে শুরু করেছে। আগে যে দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল, এখন তা কিছুটা কমছে। তবে বাজার এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, নতুন চালান আসলে দাম কমতে পারে। এখন সেগুলো আছে সব আগের (বাজেট) কেনা। এক মাসের ব্যবধানে আমদানি করা রসুনে দাম কমেছে; প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকায়। এক কেজি দেশি রসুনের কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে মানভেদে ৯০ থেকে ১৪০ টাকায়।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে দেশি রসুনের দাম ১৫ শতাংশ বেড়েছে, তবে আমদানিকৃত রসুনের দাম কমেছে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ। এদিকে আদার দাম কেজিতে প্রায় ২০ টাকা কমে বর্তমানে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, পেঁয়াজের দাম তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে। টাউন হল মার্কেটের বিক্রেতা আমান উল্লাহ জানান, পেঁয়াজ ৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে, তবে রসুন ও আদার ভালো মানের পণ্যের দাম কিছুটা বেশি। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে নতুন চালান এলে দাম আরও কমতে পারে। একই মত দেন ব্যবসায়ী মোহন মোল্লাও। তার মতে, আগামী সপ্তাহ থেকে নতুন আমদানির পণ্য বাজারে আসতে শুরু করবে এবং মাসের মাঝামাঝি থেকে ধীরে ধীরে দামে স্বস্তি ফিরতে পারে।

মশলার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও করছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। চাল, গম, আলুসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামানো হলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। বরং খুচরা বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। টিসিবির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে মোটা চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইজাম ও ব্রি-২৮-এর মতো মাঝারি চাল ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬৮ টাকায় এবং নাজিরশাইল ও মিনিকেট চাল ২ টাকা বেড়ে ৭২ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে বাজেটের আগে আলুর দাম কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা থাকলেও এখন তা বেড়ে ৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। টিসিবির তথ্য বলছে, এক মাসে আলুর দাম ২২ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি সপ্তাহের ব্যবধানে কাঁচা মরিচের দাম ১০ শতাংশ এবং বেগুনের দাম সাড়ে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

** দাম বাড়তে ও কমতে পারে যেসব পণ্যের
** বাজেট ২০২৬-২৭: যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে
** বাজেট ২০২৬-২৭: যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে
** নিত্যপণ্য সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর বাড়ছে না