** সমালোচনার পর খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট বসানো থেকে সরকার আসছে সরকার
** তিনমাস পর ভ্যাট রিটার্ন ও প্রযোজ্য ভ্যাট জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে
** ব্যক্তি করদাতার ফাইলে স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স ৫ শতাংশ করা হচ্ছে
** ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ই-টিআইএন এর বাধ্যবাধকতা বাতিল হচ্ছে
** মাছ ক্রয়-বিক্রয়ে ১০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার হচ্ছে, থাকছে আমদানিতে ভ্যাট
** জমি-ফ্ল্যাটে নিয়মিত কর দিয়ে প্রকৃত মূল্য দেখানো বা কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল হচ্ছে
শর্ত সাপেক্ষে আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য কর্পোরেট করহারে আড়াই শতাংশ হারে ছাড় দেওয়া হতে পারে। মূলত বিনিয়োগ উৎসাহিত, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর জিডিপি বাড়াতে ব্যবসার ক্ষেত্রে এই ছাড় দেওয়া হতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আড়ালে করহার ছাড় দেওয়া হতে পারে ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হতে পারে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। আর ব্যাপক সমালোচনার পর খুচরা ব্যবসায়ীদের উপর ভ্যাট বসানো হতে সরে আসতে পারে সরকার। ব্যাংক হিসাব খুলতে ই-টিআইএন এর বাধ্যবাধকতা বাতিল হতে পারে। পাশাপাশি ফ্ল্যাট ও জমি বিক্রির প্রকৃত মূল্য দেখানোর মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার প্রস্তাবও বাতিল হতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই ধরনের ছোট-খাটো পরিবর্তন এনে ৩০ জুন বাজেট পাশ করা হচ্ছে। একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
করপোরেট কর কমছে আড়াই শতাংশ
এনবিআর সূত্রমতে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর কর্পোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হতে পারে। বিনিয়োগ উৎসাহিত, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর জিডিপি বাড়াতে কর্পোরেট করে এই ছাড় দেওয়া হতে পারে। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে কর্পোরেট কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়নি। বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান, যাদের পরিশোধিত মূলধনের অন্যূন ১০ শতাংশের নিচে, তাদের করহার করহার সাড়ে ২২ শতাংশ রয়েছে। তবে ক্যাশলেস বা ব্যাংকে লেনদেনের শর্ত পরিপালনে ২০ শতাংশ বহাল রাখা হচ্ছে। তবে যাদের ১০ শতাংশের নিচে, তাদের করহার শর্ত পরিপালন সাপেক্ষে ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ করা হচ্ছে। বাকিদের করপোরেট করহার অপরিবর্তিত থাকবে। বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ছাড়লে কর হার ২০ শতাংশ। সাধারণ কোম্পানির কর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর ৪০ শতাংশ, তামাক প্রস্তুতকারক কোম্পানি কর ৪৫ শতাংশ, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মোবাইল অপারেটরের কর ৪০ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত মোবাইল অপারেটর ৪৫ শতাংশ, ট্রাস্ট, ব্যক্তিসংঘ ও ফার্মের করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ, সমবায় সমিতি ২০ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শতাংশ।
স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হচ্ছে
এনবিআর সূত্রমতে, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার আয়কর ফাইলে থাকা স্বর্ণ বিক্রির গেইন ট্যাক্স ৫ শতাংশ করা হতে পারে, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১৫ শতাংশ করা হয়। অর্থাৎ স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বিক্রি থেকে আয় দেখালে তার ক্যাপিটাল গেইন বা মুনাফার উপর ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে, যা আগে ছিলো না। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, অঘোষিত সম্পদ বৈধ করতে কর ফাইলে বাড়তি স্বর্ণের মজুত দেখানোর যে প্রবণতা রয়েছে, তা ঠেকাতেই মূলত এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি করদাতার করফাইলে স্বর্ণ হলো একটি ভৌতিক সম্পদ। অনেকেই ২০-৪০ ভরি স্বর্ণ দেখালেও মূল্য অজানা দেখায়। অথচ বাস্তবে ওই করদাতার স্বর্ণ ১-২ ভরিও নেই। ভবিষ্যতে অজানা উৎস থেকে আসা অর্থ বা সম্পদ কর না দিয়ে কর ফাইলে দেখানোর সুযোগ রাখতেই অনেকে এভাবে স্বর্ণের মজুত দেখান। পরে সেই অর্থকে স্বর্ণালংকার বিক্রির আয় হিসেবে দেখানো হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, একজন করদাতা যেদিন থেকে আয়কর ফাইল খুলেছেন, সে সময় স্বর্ণের দাম যা ছিলো, বর্তমানে বিক্রির সময় যে দাম পাবেন, করফাইল খোলার দামের থেকে বিক্রির দাম বাদ দিলে যে লাভ বা গেইন হবেন, তার উপর ৫ শতাংশ কর দিতে হবে। অর্থবিল, ২০২৬-করদাতার রিটার্নে ঘোষিত স্বর্ণ, রুপা, গহনা, মূল্যবান পাথর, হীরা, মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা, শিল্পকর্ম, পুরাকীর্তি ও ক্লাবের সদস্যপদ বিক্রি বা হস্তান্তর থেকে অর্জিত মুনাফাকে মূলধনি মুনাফা হিসেবে গণ্য করে ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করা হচ্ছে
এনবিআর সূত্রমতে, আগামী অর্থবছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহারও কমানো হতে পারে। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে করহার ১০ শতাংশ রয়েছে, তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে। মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ আরো উন্নত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার এই করহার কমিয়ে আনছে। তবে আগামী অর্থবছর করহার কমাতে কোন শর্ত দেওয়া হচ্ছে না। ভবিষ্যতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই করহার বহাল রাখার ক্ষেত্রে সরকার শর্তারোপ করতে পারে বলে জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ইউজিসি অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬টি। তবে চালু রয়েছে ১০৩টি। এছাড়া ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ২৬টি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, ২০টি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে।
করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ, ২০২৭-২৮ অর্থবছর সাড়ে ৪ লাখ করা হচ্ছে
এনবিআর সূত্রমতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়নি। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব না করায় বিভিন্ন মহলে সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া এবং করদাতাদের স্বস্তি দিতে অবশেষে আগামী অর্থবছর ২৫ হাজার টাকা করে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হতে পারে। বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রয়েছে, যা বেড়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য করদাতাদের ২৫ হাজার টাকা করে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হতে পারে। যদিও প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছর করমুক্ত আয়সীমা বহাল রাখা অর্থাৎ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এছাড়া ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছর ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছর ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর ৪ লাখ এবং ২০২৭-২৮, ২০২৮-২৯ অর্থবছর সাড়ে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছর পাঁচ লাখ টাকা করা হতে পারে। তবে রেয়াতের সীমা কমানো এবং সঞ্চয়পত্র, সরকারি সিকিউরিটিজ, এফডিআর-এর সুদ থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করকে চূড়ান্ত কর দায়ের বদলে অগ্রিম কর হিসাবে গণ্য করায় করদাতাদের ওপর করের বোঝা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এছাড়া শেয়ারবাজারের স্বার্থে লভ্যাংশ কর আগের মতোই ২০ শতাংশ রাখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থবিল সংশোধনের মাধ্যমে লভ্যাংশের এই করহার বিলুপ্ত করা হয়। ফলে লভ্যাংশ আয়ের ওপর নিয়মিত করপোরেট করহার প্রযোজ্য হয়। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থবিলের মাধ্যমে আয়কর আইনের প্রথম তফসিলে সংশোধন এনে ‘স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন’ নামে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে নিয়মিত হারে কর দিয়ে বিনা প্রশ্নে জমি-ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়, যা চূড়ান্ত বাজেটে বাতিল হচ্ছে
খুচরা ব্যবসায় ভ্যাট বসছে না, সাপ্লাইয়ে হাজার প্রতি ২ টাকা কর থাকছে
এনবিআর সূত্রমতে, সমালোচনার মুখে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ওপর প্রস্তাবিত ‘স্পেসিফিক ভ্যাট’ বসানো থেকে সরে আসছে সরকার। প্রস্তাবে মুদি দোকান থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায়ে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী এই ভ্যাটের আওতায় চলে আসতো। বাজেট প্রস্তাব করার পর থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখার দাবি জানিয়েছে আসছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১৬টি ব্যবসা খাত ভ্যাটের আওতায় (স্পেসিফিক ভ্যাট) যুক্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। খাতগুলো হলো- মুদির দোকান, তৈরি পোশাক বা কাপড়ের বিক্রেতা, কনফেকশনারি, কসমেটিকসের দোকান, প্লাস্টিকের ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্য, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার পণ্যের বিক্রেতা, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার এবং সেনিটারি ও ফিটিংস, টাইলসের দোকান, ঢেউটিনের দোকান, রড ও সিমেন্ট, ফার্নিচার, বিউটি পার্লার, মিষ্টান্ন ভান্ডার ও রেস্টুরেন্ট। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরপরই বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় উঠে। এরই প্রেক্ষিতে খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট বসানো থেকে পিছু হটে সরকার। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী অর্থবছর প্যাকেজ ভ্যাট এর মতো ‘সুর্নিদিষ্ট ভ্যাট’ ব্যবস্থা চালু করতে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। মূলত ছোট ও প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনতে এই ব্যবস্থা চালু করতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা অনুরোধ জানিয়ে আসছে। মূলত ব্যবসায়ীদের দাবি, যারা ভ্যাট দেন, সরকার প্রতিবছর তাদের উপর ভ্যাটের বোঝা ছাপিয়ে দেন। প্রান্তিক পর্যায়ে বহু ভ্যাটযোগ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলোকে ভ্যাটের আওতায় আনতে আবারো প্যাকেজ ভ্যাট বা সুর্নিদিষ্ট ভ্যাট (স্পেসিফিক ভ্যাট) চালু করার অনুরোধ জানিয়ে আসছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার আগামী অর্থবছর এই ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেয় সরকার। স্পেসিফিক ভ্যাট চালু হলে অন্তত ১০ লাখ নতুন প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় চলে আসতো। এছাড়া বাজেটে কোন শর্ত ছাড়াই তিনমাস অন্তত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
