কবিরহাটে দুই সন্তানের জননীর আত্মহত্যা

** স্বামীর পরিবারের দাবি, চাঁদনির দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হওয়ার পর থেকে গত ৭ মাস ধরে সে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন
** চাঁদনির বাবার দাবি, তার মেয়েকে শ্বাশুড়ি, ননদসহ পরিবারের সদস্যরা মানসিক যন্ত্রণা ও তাবিজ করে মেরে ফেলেছেন

নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় ইয়াসমিন আক্তার চাঁদনি (২৪) নামের দুই সন্তানের জননী এক গৃহবধু আত্মহত্যা করেছেন। শনিবার (৭ মার্চ) পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড সেলিম মিয়ার নতুন বাড়িতে চাঁদনি আত্মহত্যা করেছেন। স্বামীর পরিবারের দাবি, চাঁদনি দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার পর থেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। চাঁদনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শ্বশুর বাড়িতে হামলা করা হয়েছে। আর মেয়ের পরিবারের দাবি, তার মেয়েকে মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে এবং তাবিজ করে মেরে ফেলা হয়েছে। চাঁদনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নিহতের স্বামী ও বাবার বাড়ির স্বজনদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

দুই পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কবিরহাট পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের খলিল হাজীর বাড়ির মো. জাকির হোসেনের দ্বিতীয় ছেলে শাহেদ মোহাম্মদ রাসেল হোসেনের সাথে চাঁদনির বিয়ে হয়। এই দম্পতির ঘরে ৬ বছরের একটি ছেলে (আবদুল্লাহ রিদওয়ান) এবং ৭ মাস বয়সী একটি কন্যা (হুমায়রা) সন্তান রয়েছে। চাঁদনির স্বামী শাহেদ মোহাম্মদ রাসেল হোসেন একজন আইনজীবী। বর্তমানে তিনি ওয়ালটন হাইটেক পার্কে চাকরি করেন। চাঁদনির দ্বিতীয় সন্তান (কন্যা সন্তান) হওয়ার পর থেকে সে তাঁর বাবার বাড়িতে থাকেন।
WhatsApp Image 2026 03 15 at 7.06.07 PM
চাঁদনির স্বামীর পরিবারের দাবি, দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার পর থেকে চাঁদনির মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই নিয়ে চাঁদনির স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা তাকে মানসিক চিকিৎসা করাতে থাকেন। প্রথমে ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর নোয়াখালীতে ইবনে সিনা হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডা: জেবুন নাহারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করাতে থাকেন। স্বাস্থ্যের উন্নতি না হওয়ায় জেবুন নাহারের পরামর্শে চাঁদনিকে ১২ ডিসেম্বর নোয়াখালীর প্রাইম ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেডে অধ্যাপক ডা: এ এইচ মুস্তাফিজুর রহমানকে দেখানো হয়। মুস্তাফিজুর রহমানের পরামর্শে চিকিৎসা চলতে থাকে। তবে চিকিৎসক দেখানোর পর ওষুধ দেওয়া হলেও চাঁদনি ওষুধ খেতো না। চাঁদনির পরিবার চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ তাকে খাওয়াতো না। মেয়েকে তাবিজ করা হয়েছে, সেই তাবিজ কাটানোর জন্য বিভিন্ন সময় বৈদ্য ও হুজুরের কাছে যেতো। তাবিজ কাটানো হতো। কিন্তু চাঁদনি সুস্থ হয়নি।

চাঁদনির স্বামী শাহেদ জানিয়েছেন, মূলত মানসিক সমস্যার ওষুধ না খাওয়াতে চাঁদনির মানসিক সমস্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। এমনকি প্রায় সময় তার নবজাতক সন্তানকে মেরে ফেলার চেষ্টা করতো। সে প্রায় সময় বলতো সে আর কখনো সুস্থ হবেন না। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) শাহেদ ঢাকা থেকে বাড়ি গিয়েছেন। রাতে শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে বাচ্চাদের দেখে এসেছেন। চাঁদনির জন্য ঈদের জামা নিয়েছেন। চিকিৎসের দেওয়া ওষুধ খাইয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে নিজের বাড়িতে চলে এসেছেন। ভোর ৪টার গাড়িতে তিনি ঢাকায় চলে এসেছেন। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ছোট শালা নাহিদের সঙ্গে কথা হয়। সে জানায়, চাঁদনি ঘুম থেকে উঠেছেন, ভালো আছেন। ১২টার দিকে শ্বশুর ফোনে জানিয়েছেন যে চাঁদনি তাদের পুরাতন ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ফাঁস দিয়েছেন।
WhatsApp Image 2026 03 15 at 7.06.07 PM 1

শাহেদ অভিযোগ করে বলেন, এই ঘটনার পর থেকে চাঁদনির পরিবারের লোকজন তাঁর বোন ও পরিবারের সদস্যদের ওপর একাধিকবার হামলা চালিয়েছেন। ফাঁস দেওয়ার পরপরই পুলিশের সহায়তায় চাঁদনিকে কবিরহাট ৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে পুলিশ চাঁদনির লাশ উদ্ধার করে নোয়াখালী সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যায় লাশ চাঁদনির বাবার বাড়িতে নিয়ে আসেন। শনিবার রাত ১০টার দিকে চাঁদনিকে তার বাবার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। দাফন করার পরপরই চাঁদনির ভাই নিরবের নেতৃত্বে ২০-২৫ জন আমাকে মেরে ফেলার জন্য লাঠি নিয়ে তাড়া করেন। জান বাঁচাতে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা এক বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তবে আশ্রয়দাতার ভাংচুরের চেষ্টা চালায়। পরে রাতের অন্ধকারে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এলাকা থেকে চলে আসি। চাঁদনির পরিবার আমার পরিবারের লোকজনকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আসছে। আমি, আমার মা ও আমার বোনের বিরুদ্ধে কবিরহাট থানায় মামলা করেছেন।

অন্যদিকে, হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেন চাঁদনির বাবা মো. সেলিম মিয়া। মেয়ের মৃত্যুর জন্য জামাতাকে দায়ী করে তিনি বলেন, আমার মেয়ের এই পরিণতির পেছনে তার স্বামী শ্বাশুড়ি ও ননদের হাত রয়েছে। শ্বাশুড়ি চাঁদনিকে হুমকি দিয়েছিলো যে, তাকে (চাঁদনি) মেরে ফেলবে। আমার মেয়েকে শ্বাশুড়ি ও ননদ বিভিন্ন সময় মানসিকভাবে যন্ত্রণা দিয়েছেন। আমার মেয়েকে তাবিজ করে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমার একমাত্র মেয়ে হত্যার বিচার চাই।

বিষয়টি নিশ্চিত করে কবিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নিজামুল উদ্দিন ভুঁইয়া বলেন, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং সেই অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।