এলডিসি উত্তরণে ৩ বছর সময় পাচ্ছে বাংলাদেশ

জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর সরকারি অনুরোধকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করেছে। কমিটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উত্তরণ প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো যৌক্তিক হবে। তবে এই অতিরিক্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানিয়েছে।

সিডিপির চেয়ারম্যান জোসে আন্তোনিও ওকাম্পো বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছেন, কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ যদি বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা যৌক্তিক হবে। তবে এই সময়কে কোনোভাবেই সংস্কার কার্যক্রম বিলম্বিত করার সুযোগ হিসেবে নেওয়া যাবে না; বরং এটি সংস্কার বাস্তবায়নকে আরও গতিশীল করার একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণকে শুধু সময় বৃদ্ধির মাধ্যমে নয়, বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই করতে হবে। এজন্য একক সেবাকেন্দ্র (সিঙ্গেল উইন্ডো) ব্যবস্থা কার্যকর করা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও জটিলতা কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। তার মতে, এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা গেলে বাংলাদেশ এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করে উত্তরণের সুফল দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে সক্ষম হবে।

সিডিপির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি সূচকের প্রতিটিতেই প্রয়োজনীয় সীমা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে অতিক্রম করেছে এবং নিকট ও মধ্যমেয়াদে এসব সূচকে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি খুবই কম। তবে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তন এবং অন্যান্য বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ দেশের উত্তরণ প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও সতর্ক করেছে কমিটি।

বাংলাদেশ প্রণীত স্মুথ ট্রান্সিশন স্ট্রাটেজি (এসটিএস) বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে সিডিপি। কমিটির মতে, প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি করা হলে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব আরও গভীরভাবে মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং উত্তরণ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক বাজার সুবিধা ও সহায়তা ব্যবস্থার জন্য অধিকতর কার্যকর প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে প্রস্তুতিকাল এবং উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সিডিপি। এ সহযোগিতার মধ্যে সহজ শর্তে অর্থায়ন, এলডিসি-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সুবিধার যথাযথ সম্প্রসারণ, কারিগরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কমিটি বিশেষভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রমের ওপর জোর দিয়ে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কর আহরণ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ জোরদার করা, উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়ন, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করার আহ্বান জানিয়েছে। সরকার সিডিপির ইতিবাচক মূল্যায়ন ও সুপারিশকে স্বাগত জানিয়েছে। সরকারের বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং চলমান অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি টেকসই, মসৃণ ও সফল এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণকে টেকসই ও ফলপ্রসূ করতে বাংলাদেশ যে ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ গ্রহণ করেছে, তার আলোকে আগামী জাতীয় বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তার মতে, বেসরকারি খাতকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে এবং শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, নতুন শিল্প, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি ত্বরান্বিত করতে বাজেটে ‘ইনোভেশন ফান্ড’ ও ‘স্টার্টআপ ফান্ড’-এর মতো বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যা নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে কেবল আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না; বরং দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ভিত্তিতে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, বাজার-সুবিধা নির্ভর সক্ষমতা থেকে সরে এসে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাভিত্তিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগোতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে আসন্ন বাজেটে শিল্প খাতের বিকাশ, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট, বাস্তবমুখী ও রূপান্তরমূলক নীতির প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। তার মতে, এসব সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপই বাংলাদেশের উত্তরণকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও সফল করে তুলবে।

বিএনপি সরকার এসে ফেব্রুয়ারিতে সিডিপির কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত সম্প্রসারণের আবেদন জানায়। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সিডিপির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত চিঠি পাঠানো হয়।

তাতে বলা হয়, মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক— উত্তরণের এই তিনটি শর্ত পূরণ অব্যাহত থাকলেও পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময়কাল বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা ধাক্কায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সরকার এক্ষেত্রে কোভিড মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, বিশ্বব্যাপী কঠোর আর্থিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতির পুনরুদ্ধারের কথা উল্লেখ করেছে। অভ্যন্তরীণ কারণ হিসেবে আর্থিক খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন ও বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়ার চলমান চাপের কথা জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, এসব অভিঘাতের ফলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বৃদ্ধি, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি হ্রাস এবং কম বিনিয়োগের কারণে নতৃন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও কমেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের নীতিগত মনোযোগ স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে সরে যাওয়ায় কারণে প্রস্তুতিমূলক সময়কালটি আশানুরূপভাবে কাজে লাগানো যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।

এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা হারানোর আশঙ্কা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পাল্টা শুল্কারোপের ঝুঁকি। ইএমএমের অধীনে সংকট মোকাবিলা বিধানটি ব্যবহার করে বাংলাদেশ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং তার স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির আওতায় অগ্রাধিকারমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য তিন বছরের সময় বৃদ্ধি চেয়েছে।