এমটিএফই প্রতারণার ৪৪ কোটি টাকা উদ্ধার

বহুল আলোচিত মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই)–এর প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া ৪৪ কোটি টাকা দেশে ফিরিয়ে এনেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই অর্থ গ্রাহকদের কাছে ফেরত দেওয়া সহজ হবে না, বরং জটিল প্রক্রিয়ার কারণে তা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

টাকা উদ্ধার বিষয়ে সোমবার (৩০ মার্চ) রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার। তিনি জানান, উদ্ধার হওয়া অর্থ বর্তমানে সিআইডির অ্যাকাউন্টে রয়েছে। তবে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও তা গ্রাহকদের কাছে ফেরত দেওয়া সহজ নয়, কারণ এতে আইনি জটিলতা রয়েছে। আদালত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনসহ নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, যা বেশ জটিল। তিনি দেশবাসীকে এ ধরনের প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এসব প্রক্রিয়ায় জড়াতে না চাইলে এমন বিনিয়োগ এড়িয়ে চলাই ভালো। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এগুলো বিদেশি অ্যাপ, যা বিভিন্ন কৌশলে দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করছে।

দেশে এদের কোনো এজেন্ট আছে কিনা জানতে চাইলে ডিআইজি আবুল বাশার বলেন, সেটা তো অবশ্যই আছে। এরা গ্লোবালি কাজ করে। এদের হাজারটা এজেন্ট আছে। যেদিন আমরা এজেন্ট ধরে ফেলতে পারব, সেদিন তো মামলা ডিটেক্ট হয়ে গেল। কত মানুষ এই এমটিএফইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানতে চাইলে আবুল বাশার বলেন, এটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব না। অনেকে লজ্জায় কাউকে কিছু বলছেন না বা মামলা করেননি। স্বামী টাকা খুইয়ে স্ত্রীকে বলতে পারেননি, ‌ ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মাকে জানায়নি। আবার অনেকেই জানেন না এই ধরনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কোথায় প্রতিকার পাওয়া যায়।

মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই) নিজেকে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে পরিচয় দিয়ে এমএলএম পদ্ধতিতে পরিচালিত একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চার বছর আগে কার্যক্রম শুরু করে। ২০২৩ সালে এর প্রতারণামূলক তৎপরতা চরমে পৌঁছায়, যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে অফিস খুলে রাজশাহী, কুমিল্লা, বরিশালসহ নানা এলাকার মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে ওই বছরের মাঝামাঝি থেকে গ্রাহকেরা আর টাকা তুলতে না পেরে বিপাকে পড়েন এবং একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেশ থেকে উধাও হয়ে যায়। এ ঘটনায় আগস্টে খিলগাঁও থানায় মারুফ রহমান মাহিম নামে এক ব্যক্তি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করলে তদন্তভার পায় সিআইডি।

সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফোরেক্স ট্রেডিংয়ে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে পরিচালিত ‘প্রতারণামূলক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম’ এমটিএফইয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিদেশে পাচার করা অর্থের একটি অংশ, প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ৪৪ কোটি ১৪ রাখ ৬২ হাজার ৩০৩ টাকা) উদ্ধার করেছে সিআইডি। এমটিএফই এর পঞ্জী স্কিমের প্রতারণার শিকার হয়ে একজন ভুক্তভোগী খিলগাঁও থানায় মামলা করেন। তবে সিআইডি তদন্তে নেমে এরকম ‘অসংখ্য’ বিনিয়োগকারীর কোটি কোটি টাকা খোয়ানোর তথ্য পায়।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, এমটিএফই একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ফোরেক্স ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, যা অল্প সময়ে বেশি মুনাফার লোভ দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করত। ২০২২ সালের জুন থেকে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু হয় এবং ঘরে বসে সহজে আয় করার প্রলোভন দেখিয়ে ফেসবুক ও ইউটিউবে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। এসব প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহী হন। ২০২৩ সালের শুরুতে প্ল্যাটফর্মটির বিস্তার দ্রুত বাড়ে। বিনিয়োগকারীদের ভার্চুয়াল ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট দেওয়া হলেও সেখানে জমা অর্থ ডিজিটাল ডলার হিসেবে দেখানো হতো, যা বাস্তবে ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। কৃত্রিমভাবে লাভ-ক্ষতির তথ্য তৈরি করে ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন করা হতো।

এমটিএফই স্কিম প্রাথমিকভাবে কিছু অর্থ পরিশোধ করে ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন করে। পরে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এমটিএফই হঠাৎ সব কার্যক্রম বন্ধ করে উধাও হয়ে যায়। ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত ভার্চুয়াল মুদ্রা ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বিনিয়োগকারীদের অর্থ এমটিএফইয়ের মূল ওয়ালেটে জমা হয়ে সেখান থেকে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটে ছড়িয়ে দেওয়া হত। এভাবে বাংলাদেশের থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয় বলে সিআইডির তদন্তে উঠে আসে।

প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ, প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার টেথার ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ওকেএক্স-এ সংরক্ষিত রয়েছে বলে সিআইডি জানতে পারে। পরে ব্লকচেইন বিশ্লেষণ টুল চেইনেনালাইসিস রিএ্যাক্টর ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ওই অর্থ এমটিএফই প্রতারণা চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট।