দেশের অধিকাংশ পরিবারে অন্তত একজন সদস্য স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও কম আয়ের মানুষেরা এখনও এই সুবিধা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকের পক্ষেই স্মার্টফোন কেনা সম্ভব হয় না। এই প্রেক্ষাপটে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান পামপে লিমিটেড স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য স্মার্টফোন কেনায় ঋণ সুবিধা চালু করেছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। গত এপ্রিল মাসেই প্রতিষ্ঠানটি এক লাখের বেশি মানুষকে স্মার্টফোন কেনার জন্য ঋণ দিয়েছে, যার মোট পরিমাণ ১৯৪ কোটি টাকারও বেশি।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) পাওয়ার পর থেকে নিয়মিতভাবে মাসভিত্তিক ঋণ বিতরণের তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়ে আসছে। গত এপ্রিল মাসের মাসিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ১৯ শতাংশ ছিলেন নারী এবং প্রায় ৫০ শতাংশ গ্রাহক প্রথমবারের মতো স্মার্টফোন ব্যবহার শুরু করেছেন। এছাড়া প্রায় ৭১ শতাংশ গ্রাহক স্মার্টফোনের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা নিচ্ছেন, আর ৩৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন শিক্ষা–সংক্রান্ত ফি পরিশোধে এই ফোন ব্যবহার করছেন।
পামপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুন জেং ইথান দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘এখন স্মার্টফোন কোনো বিলাসিতা নয়; বরং আধুনিক সমাজে অংশগ্রহণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। এ পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা বাই নাউ পে লেটার স্মার্টফোন অর্থায়ন পাইলট প্রকল্প চালু করেছি। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের অনুমোদন দিয়েছে।’ জুন জেং ইথান আরও বলেন, ‘এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সহজ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল অর্থায়ন সমাধানের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্মার্টফোন কেনার সুযোগ আরও সহজ করা। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো স্মার্টফোন ব্যবহারকারী, নারী ও স্বল্প আয়ের মানুষদের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির আওতায় নিয়ে আসা আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্মার্টফোন কেনার ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ৪৪ হাজার ২৭৭ জন গ্রামীণ অঞ্চল থেকে এবং ৫২ হাজার ৩২৮ জন শহরাঞ্চল থেকে এই সুবিধা নিয়েছেন। গ্রাহকেরা সাধারণত স্মার্টফোনের মোট মূল্যের প্রায় ১৮ শতাংশ এককালীন ডাউনপেমেন্ট হিসেবে পরিশোধ করে বাকি অর্থ ঋণের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছেন। আরও জানা যায়, অধিকাংশ গ্রাহক ১৫ হাজার টাকা বা তার বেশি মূল্যের স্মার্টফোন কেনার জন্য ঋণ নিয়েছেন। এই শ্রেণিতে প্রায় ৬৪ হাজার গ্রাহকের কাছে ১৪৭ কোটি টাকারও বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
কীভাবে ফোন কিনবেন
দেশে বর্তমানে তিনটি স্মার্টফোন ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে এই ঋণ দিচ্ছে পামপে। এগুলো হলো টেকনো, ইনফিনিক্স ও আইটেল। বর্তমানে পুরো দেশজুড়ে এই তিন ব্র্যান্ডের প্রায় ৫ হাজার বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে পামপের। এই সেবা নিতে হলে এসব বিক্রয় প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাহকদের ফোন কিনতে হবে। এই চুক্তির আওতায় ফোন কেনার সময় প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহককে সরাসরি কোনো টাকা দেবে না। তবে টাকার পরিবর্তে ফোন কিনে দেবে। ঋণ পেতে এই তিন ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনের বিক্রয়কেন্দ্রে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যেতে হবে গ্রাহককে। পাশাপাশি একজন গ্যারান্টারের জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে। এর সঙ্গে নিতে হবে ব্যাংক অথবা আর্থিক স্টেটমেন্টের তথ্য। কেউ যদি ব্যবসায়ী হন, তাহলে তাঁর ব্যবসার আর্থিক তথ্য নিয়ে যেতে হবে। আর ডিজিটাল ব্যাংকিং করলে তার তথ্য নিয়ে যাওয়া যাবে।
স্মার্টফোন ঋণ পেতে গ্রাহকদের নির্ধারিত তিনটি ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্রে থাকা ব্র্যান্ড প্রোমোটরের (বিপি) কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়; পাশাপাশি পামপের অ্যাপ ব্যবহার করেও এই সুবিধা নেওয়া যায়। স্মার্টফোন কেনার ক্ষেত্রে শুরুতে মোট মূল্যের ১৫ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিতে হয় এবং বাকি অর্থ ৬ বা ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়। কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব হলে প্রথমে খুদে বার্তা পাঠানো হয়, এরপর বিশেষ নোটিশ দেওয়া হয়; তবুও পরিশোধ না করলে ধাপে ধাপে ফোনটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। পামপের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ৪ কোটি ব্যবহারকারী ও ১০ লাখ মার্চেন্টকে সেবা দিচ্ছে এবং প্রতিদিন দেড় কোটির বেশি লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে। ব্যাংকিং ও স্মার্টফোন অর্থায়নের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য আর্থিক সেবার বিস্তার ঘটানো, নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা এবং ব্যাপক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। বর্তমানে পামপে নাইজেরিয়া, ঘানা, তানজানিয়া ও বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং শিগগিরই আরও কয়েকটি দেশে সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
