একীভূত অবস্থাতেই থাকছে পাঁচ ব্যাংক

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধন করে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপনের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটিকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার কাজ করে আগামী রোববারের মধ্যে সংশোধনী প্রস্তাব জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে একীভূত পাঁচটি ব্যাংক আগের অবস্থাতেই থাকছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরও কয়েকটি ব্যাংক একীভূত বা অবসায়নের যে পরিকল্পনা ছিল, আইন সংশোধনের পর সেটি বাস্তবায়ন হবে কিনা—তা তখনই স্পষ্ট হবে।

গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করে। এই অধ্যাদেশ ও ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের ৩৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা, এবং আমানতকারীদের মধ্যে ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিতরণ করা হবে। এছাড়া আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যবহার করে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার জন্য একটি স্কিম ঘোষণা করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর তা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করতে হয় এবং ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যায়। যে কারণে এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট পেশের জন্য ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি করা হয়। ওই কমিটি ব্যাংক রেজল্যুশনসহ ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে। যদিও দেশের স্বার্থে এবং আর্থিক খাতে অনিয়ম বন্ধে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশটি অপরিবর্তিত অবস্থায় পাসের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য।

জানা গেছে, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে সংশোধনীর বিষয়ে গতকালই বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সমন্বয়ে সাত সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে আজ শুক্র ও আগামীকাল শনিবার কাজ করে রোববারের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। সে আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে নির্ধারিত সময় সংশোধিত আইনটি সংসদে উত্থাপন করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী অধ্যাদেশটি সংশোধন বা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত যত কাজ হবে, তা বৈধ। আবার পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ কেবল এই অধ্যাদেশের আলোকে হয়েছে, তেমন নয়। ব্যাংক কোম্পানি আইনও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে ন্যাশনাল, এবি ও আইএফআইসি ব্যাংকের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সম্পদের গুণগত মান যাচাই (একিউআর) সম্পন্ন করা হয়েছিল। বিষয়টি আর এগোবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। অবশ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ ক্ষেত্রে স্বোচ্চার আছে জানিয়ে তিনি বলেন, মূলধন ঘাটতি নিয়ে যেসব ব্যাংক চলছে, তাদের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির পরবর্তী কিস্তি ছাড়ে এ বিষয়টি দেখা হবে।

ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আলোকে সাময়িক সময়ের জন্য একটি দুর্বল ব্যাংক সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মালিকানায় নেওয়া যায়। বিভিন্ন আর্থিক সূচকের ভিত্তিতে দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করে রেজল্যুশন বা নিষ্পত্তি তথা অবসায়ন, একীভূতকরণ বা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি কিংবা নতুন শেয়ার ইস্যুসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিতসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে আলাদা একটি বিভাগ খোলা হয়।

কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের জমানো অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাপক আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়। তাই রেজল্যুশনের মাধ্যমে এসব ব্যাংক পুনর্গঠন করে পুনরায় বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে আর্থিক ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা বজায় রাখা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং ব্যাংকের লেনদেন সচল রাখা হলো মূল উদ্দেশ্য। রেজল্যুশনের আওতায় অধ্যাদেশে নির্দিষ্ট কয়েকটি সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশিত মূলধন বা তারল্য সংরক্ষণের শর্ত পূরণে ব্যর্থতা, কোনো ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়া বা হওয়ার পথে থাকা, আমানতকারী বা অন্যান্য পাওনাদারের দায়বদ্ধতা পূরণে অক্ষম থাকা, এবং ঋণের নামে অর্থ প্রতারণামূলকভাবে তোলা। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের আওতায় সেই ব্যাংককে নিষ্পত্তি করার সুযোগ রাখা হয়েছে।