একবারেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল এক ধাপেই বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। কারণ, দুই ধাপে বেতন কাঠামো কার্যকর করলে আইবাস সিস্টেমে (অনলাইন বেতন নির্ধারণ ব্যবস্থা) সমন্বয় জটিল হয়ে পড়তে পারে। তবে একবারে বাস্তবায়ন করা হলেও কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বেতনের হার কিছুটা কমানো হতে পারে। অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সরকারের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সভা সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে সভাপতিত্ব করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও এতে আইবাস সিস্টেমে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি দুই ধাপে বাস্তবায়ন করলে ব্যয়ও বাড়বে এবং এতে চাকরিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।

জানা যায়, বর্তমানে অষ্টম বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা। নবম বেতন কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১ থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বাড়তে পারে ৬০-৭০ শতাংশ, আর ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৯০-১০০ শতাংশ।

আজকের বৈঠকে কমিশনের বিভিন্ন প্রস্তাবের আর্থিক প্রভাব, বাস্তবায়নের সময়সূচি, ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয় এবং বিভিন্ন ক্যাডার ও শ্রেণির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে কোন প্রস্তাবগুলো সরকার গ্রহণ করবে, কোথায় সংশোধন আনা হবে এবং বাস্তবায়নের রোডম্যাপ কী হবে—এসব বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে। বিশেষ করে বেতন বৃদ্ধির হার নির্ধারণ নিয়ে আজ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামোর মূল বেতন কার্যকর হতে পারে, আর ভাতাগুলো কার্যকর হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে।

সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, সরকারি চাকরিজীবীর নতুন পে স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন হলে আইবাস সিস্টেমে সমন্বয় করা কঠিন হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীর সুবিধা দেওয়ার পরও খুশি করতে পারবে না। এ জন্য প্রথম বছরে বেতন এং পরের বছরে ভাতা সুবিধা বাস্তবায়ন করা উচিত। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের পাঁচ বছর পর বেতন বাড়ানো হয়। তবে ১১ বছর পরও সেই বেতন বাড়ানো হয়নি। এ জন্য সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বেতন বাড়ার হার নির্ধারণ করতে হবে। আবার সরকারের সক্ষমতা এবং বেসরকারি চাকরিজীবীর কথাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইন সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এই কমিটির প্রধান দায়িত্ব হলো জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি ২০২৫-এর জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিটি তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিলে প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্তভাবে পে স্কেল অনুমোদন করবেন।

কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সোমবারের বৈঠকটি চলমান পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, কমিশনের সুপারিশগুলোর যেসব বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, সেগুলোতে ঐক্য়মত গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ, মুদ্রাস্ফীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ভার বিবেচনায় রেখে একটি বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল প্রথম বছরেই বাস্তবায়ন করতে হবে। সেটা না হলে তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। যে উদ্দেশ্যে বেতন বাড়ানো হচ্ছে সেটা পূরণ হবে না। বিশেষ করে ১০ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের বিশ্লেষণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় খুব বেশি নয়। তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাজেটের ‘পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের সম্পদের ব্যবহার’ অংশে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। এই অতিরিক্ত অর্থের মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।