পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তাওফিকা ফুডস ও লাভেলো আইসক্রিম। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৮৫ কোটি টাকা, আর ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি। ঋণে আটকা থাকা এই কোম্পানির শেয়ার দাম সম্প্রতি হঠাৎ করেই দ্রুত বেড়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে এ অস্বাভাবিক দর বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে। তবু শেয়ারের দাম থামছে না; ছয় মাসে বেড়েছে প্রায় ২৫০ শতাংশ।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের এমন দ্রুত দাম বাড়া অস্বাভাবিক। লাভেলো আইসক্রিমের আর্থিক ভিত্তি খুব শক্তিশালী নয়। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর কোম্পানিটি কখনো বিনিয়োগকারীদের ১২ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারেনি। তবু সম্প্রতি শেয়ারের দাম হু হু করে বেড়েছে। এই প্রবণতা দেখে বোঝা যায়, কোনো বিশেষ চক্র কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়াচ্ছে। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৯ জানুয়ারি লাভেলো আইসক্রিমের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ২৯ টাকা ৮০ পয়সা। সেখান থেকে দফায় দফায় দাম বেড়ে এখন ১০৪ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৭৪ টাকা ২০ পয়সা বা ২৪৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ। অন্যভাবে বলা যায়, যদি কোনো বিনিয়োগকারী গত ২৯ জানুয়ারি লাভেলো আইসক্রিমের ১০ লাখ টাকার শেয়ার কেনেন, তাহলে এখন তার বাজারমূল্য ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৩২ টাকা। এ হিসাবে ১০ লাখ টাকা খাটিয়ে ছয় মাসেই মুনাফা পাওয়া গেছে ২৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকার বেশি।
শেয়ারের এমন দাম বাড়া কোম্পানিটি সম্প্রতি ২০২৩ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয় মাসের ব্যবসায় কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ১ টাকা ২৮ পয়সা, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ পয়সা বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে গরমে আইসক্রিম বিক্রি বাড়ার কারণে মুনাফা বেড়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
এদিকে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বিক্রি হয়েছে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি হয় ২৪ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নয় মাসে কোম্পানিটির বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮২ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ে ছিল ৭৪ কোটি ৬৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে, তবে কোম্পানির খরচ সেই হারে বৃদ্ধি পায়নি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নয় মাসে প্রশাসনিক খরচ ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, যা আগের হিসাব বছরের একই সময়ে ১ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা ছিল। অর্থাৎ প্রশাসনিক খরচ মাত্র ২ লাখ টাকার বেশি বেড়েছে। একই সময়ে বাজারজাত ও বিক্রির খরচ হয়েছে ৯ কোটি ৮০ লাখ ৫৯ হাজার টাকা, আগের বছরের তুলনায় ৩৮ লাখ টাকা বেশি। প্রশাসনিক ও বিক্রির ব্যয় প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও সুদজনিত ব্যয় বেড়েছে; ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নয় মাসে এটি ১০ কোটি ১৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮ কোটি ৫৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা।
সুদের পিছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হওয়ার কারণ কোম্পানিটির বিপুল পরিমাণ ঋণ রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ কোটি ৩৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। এছাড়া লিজ আছে ২৩ কোটি ৫২ লাখ ২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের জুন শেষে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ছিল ৬৮ কোটি ৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং লিজ ছিল ২২ কোটি ৭৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।
এদিকে চলতি বছরের মার্চ শেষে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কারেন্ট পোরশন দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ২৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যা গত বছরের জুন শেষে ছিল ১৯ কোটি ৪৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা। আর লিজের কারেন্ট পোরশন দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৬২ লাখ ২ হাজার টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ ২০২৩-২৪ হিসাব বছরের শেষ তিন মাসে বা চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে কোম্পানিটির ঋণের কিস্তি বাবদ ২১ কোটি ২৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং লিজের কিস্তি বাবদ ৮ কোটি ৬২ লাখ ২ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে।
এভাবে ঋণে আটকে থাকা কোম্পানিটি ২০২১ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ২০২১ সালে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ১১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। তারপর ২০২২ সালে ১২ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। কোম্পানিটির শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়তে থাকলে গত ১৩ মে ডিএসই থেকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে বার্তা প্রকাশ করা হয়। কোম্পানিটির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিএসই জানায়, সম্প্রতি লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ারের যে অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে, তার পিছনে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।
ডিএসই তথ্য প্রকাশের পরও দুই মাস পেরিয়ে গেছে, তবুও আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সতর্কবার্তার পর শেয়ার দাম ১০০ টাকা থেকে কমে ৮৩ টাকায় নেমেছিল, কিন্তু এখন আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিএসইর এক সদস্য বলেন, লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার দামের এমন ওঠাপড়ার পেছনে কারসাজির সম্ভাবনা স্বাভাবিক। কোনো বিশেষ গ্রুপ না থাকলে এভাবে দাম বাড়া সম্ভব নয়। পূর্বে অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারও এমন অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে, যা বিশেষ চক্রকে সুবিধা দিচ্ছে এবং শেয়ারবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি বলেন, লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার দাম বাড়ার পিছনে প্রকৃত ঘটনা কী, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত তদন্ত করে বের করা। যদি কোনো কারসাজির ঘটনা ঘটে তবে কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বারবার বাজারে কারসাজির ঘটনা ঘটবে। ডিএসইর আরেক সদস্য বলেন, লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার দাম বাড়ার পিছনে কোম্পানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ইন্ধন থাকতে পারে। হঠাৎ করে কোম্পানিটির বিক্রি বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা কোম্পানিটির শেয়ার দাম বাড়ার পিছনে ভূমিকা রেখেছে। এই বিক্রি বাড়ার বিষয়টি সঠিক কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত।
যোগাযোগ করা হলে লাভেলো আইসক্রিমের কোম্পানি সচিব মোহিউদ্দিন সরকার জানান, ‘শেয়ার দামের বৃদ্ধিতে কোম্পানির কোনো ভূমিকা নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে নোটিশ পেয়েছিলাম এবং আমরা জানিয়েছি যে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।’ হঠাৎ বিক্রির বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও বিশেষ করে মার্চ মাসে খুব গরম ছিল। এছাড়া এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ছিল ঈদ, যার কারণে পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেছে। গরমের কারণে স্বাভাবিকভাবেই আইসক্রিমের ওপর মানুষের আগ্রহ বেশি থাকে। আমরা কোনো অস্বাভাবিক কাজ করছি না। গত বছরের সঙ্গে নয় মাসের আর্থিক প্রতিবেদন তুলনা করলে দেখা যাবে বিক্রি প্রায় কাছাকাছি। আমরা আমাদের প্রকৃত আর্থিক চিত্রই প্রকাশ করেছি।’
ঋণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘একশ কোটি টাকা ঋণ এটার জন্য তেমন কিছু না। আমাদের টার্নওভার প্রায় একশ কোটি টাকা। আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের ঋণ বাড়েনি বললেই চলে। এগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।’ যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘যদি কোনো কোম্পানির শেয়ার দাম হঠাৎ বড় আকারে বেড়ে যায়, তাহলে সার্ভিলেন্স থেকে বিষয়টি মনিটরিং করা হয়। যদি লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার দাম বাড়ার ক্ষেত্রে কোনো ম্যানুপুলেশন বা ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
