ঋণের ১২৬ কোটি টাকাকে আয় দেখিয়ে বিপাকে অলটেক্স

পুঁজিবাজারের প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম

** আর্থিক প্রতিবেদনে দেয়া ঋণের পরিমাণ ও ব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের মধ্যে গরমিল পেয়েছেন নিরীক্ষক
** মোট তহবিলের বিপরীতে ঋণ তহবিল ৬৯ শতাংশ
** ব্যাংক ঋণের তথ্য গোপন করে ১২৫কোটি ৮৬ লাখ টাকা রিটেইন্ড আর্নিং বা সংরক্ষিত আয় হিসেবে দেখিয়েছে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ
** কোম্পানি ঋণ পরিশোধের জন্য কোনও তহবিলের ব্যবস্থা করতে পারেনি
** ৩০ জুন ২০২৫, সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য ঋণ ৩০৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা
** ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদ অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান

ঋণ ছিলো ৩০৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। যার মধ্যে ঋণের ১২৬ কোটি টাকার তথ্য গোপন করেছে প্রতিষ্ঠান। অনিয়ম এখানেই শেষ নয়, প্রতিষ্ঠানটি ঋণের এই ১২৬ কোটি টাকাকে ‘আয়’ হিসেবে দেখিয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ২০২৪-২৫ আর্থিক প্রতিবেদনে এমন মতামত দিয়েছেন নিরীক্ষক। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি ঋণের ৩০৭ কোটি ৫২ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য কোন তহবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেনি বলে নিরীক্ষক মত দিয়েছেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছেন ইসলাম কাজী সফিক অ্যান্ড কোং চার্টাড একাউন্টসের পার্টনার মো. আবদুর রহমান, এফসিএ।

নিরীক্ষক তার মতামতে জানিয়েছেন, কোম্পানিটি ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যাংক ঋণের তথ্য গোপন করে রিটেইন্ড আর্নিং বা সংরক্ষিত আয় হিসেবে দেখিয়েছে। রিটেইন্ড আর্নিং হলো কোম্পানির নীট আয় বা লাভ,যা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করা হয়নি,বরং ব্যবসায় ধরে রাখা হয়েছে। নিরীক্ষক জানান ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে কোম্পনিটির মোট তহবিল ছিল ৪৪৬ কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণ তহবিল ৩০৭ কোটি ৫২ লাখ । এ হিসেবে ঋণ তহবিল মোট তহবিলের ৬৯ শতাংশ। কোম্পানি ঋণ পরিশোধের জন্য কোনও তহবিলের ব্যবস্থা করতে পারেনি।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ সোনালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক এবং ওয়ান ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ এবং ঋণের সুদ মওকুফ এবং কম দেখিয়ে কর-পূর্ব মুনাফা, সংরক্ষিত আয় হিসেবে দেখিয়েছে। নিরীক্ষকের মতে এ টাকার পরিমাণ ১২৫ কোট ৮৬ লাখ টাকা।

তিনশ সাত কোটি টাকার খেলাপি ঋণ: নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ৩০ জুন, ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত কোম্পনিটির ৩০৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার ব্যংক ঋণ আছে। কোম্পানি ঋণ পরিশোধের জন্য কোনও তহবিলের ব্যবস্থা করতে পারেনি। নিরিক্ষক জানান আমরা আরও লক্ষ্য করেছি যে ঋণের সুদ মওকুফ হিসেবে ৩৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা মালিকানা সত্ব হিসেবে সমন্বয় করা হয়েছে। ঋণের সুদ মওকুফের কোন নথিপত্র দেখাতে পারেনি কোম্পনিটি। মালিকানা সত্ব হিসেবে সমন্বয় করলেও এ টাকা ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত বছরের জন্য আয় বিবরণীতে অন্যান্য আয় হিসেবে দেখানো হয়নি।

অলটেক্স ইন্ড্রাস্ট্রিজের কাছে সোনালী ব্যাংক পাবে ২২৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা

নিরীক্ষক জানিয়েছেন ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছর শেষে সোনালী ব্যাংক লোকাল অফিস ব্রাঞ্চে অলটেক্স ইন্ড্রাস্ট্রিজর ঋণ রয়েছে ২২৭ কোটি ৫২ লাখ ৩৭ হাজার ৬০৩ টাকা।
এবং কোম্পানিটি ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত ঋণের সুদের জন্য কোনও ব্যবস্থা করেনি। সোনালী ব্যাংক ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত ব্যাংক স্টেটমেন্ট অনুসারে ঋণের উপর সুদ নেয়নি। যদি কোম্পানি ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ব্যাংকের অনুমোদন পত্র অনুসারে ১০ শতাংশ হারে ঋণের উপর সুদ ধার্য করে, তাহলে মোট সুদ দাঁড়াবে আনুমানিক ২২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অলটেক্স এ টাকা সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণের পরিমাণ থেকে কম দেখিয়ে কর-পূর্ব মুনাফা হিসেবে দেখিয়েছে। উল্লেখ্য সোনালী ব্যংকে এ সময়ে কোম্পনিটির জমা ছিল ৩২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৪ টাকা।

প্রাইম ব্যাংকের ঋণের তথ্য: প্রাইম ব্যাংক পিএলসি- ০৫ অক্টোবর ২০২৫ এ জানায় অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ব্যাংকটি ঋণ এবং সুদ বাবদ ৯৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা পাওনা আছে। কারণ ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত বছরের জন্য কোম্পানি কর্তৃক ৬৮ কোটি ২৭ লাখ টাকার পরিমাণ ঋণের সুদ হিসেবে প্রভিশন করা হয়নি। সে হিসেবে, কোম্পানির সংরক্ষিত আয় ৬৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে এবং ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে প্রাইম ব্যাংক থেকে এ পরিমাণ ঋণ কম দেখানো হয়েছে।

ওয়ান ব্যাংকের ঋণের তথ্য: অন্যদিকে ওয়ান ব্যাংক পিএলসি, প্রিন্সিপাল শাখার কাছে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ৬২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে ঋণের সুদ হিসেবে প্রভিশন করা হয়নি। সে হিসেবে , ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে কোম্পানির রক্ষিত আয় ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে এবং ওয়ান ব্যাংকের ঋণ কম দেখানো হয়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদনে দেয়া ঋণের পরিমাণ ও ব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের মধ্যে গরমিলের ব্যাপারে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) এম এ মহসিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নিরীক্ষককের মতামতের ব্যাপারে জানতে চাইলে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের কোম্পানি সচিব জিয়াউল হক বলেন, নিরীক্ষক আর্থিক প্রতিবেদনে মতামত দেওয়ার স্বাধীনতা রাখেন। নিরীক্ষককে আর্থিক প্রতিবেদনে মতামত দিতে হয় তাই দিয়েছে। আমাদের কিছু ঋণ আছে অনেক আগের। সেগুলোর সব তথ্য সঠিকভাবে দেওয়ার চেস্টা করেছি।

নিরীক্ষক জানান ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে কোম্পনিটির মোট তহবিল ছিল ৪৪৬ কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণ তহবিল ৩০৭ কোটি ৫২ লাখ। এ হিসেবে ঋণ তহবিল মোট তহবিলের ৬৯ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৫৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এরমধ্যে কোম্পানিটির পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৮ দশমিকি ২৩ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৫৫ এবং ৪৯ দশমিক ২২ শতাংশ শেয়ার।

সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিবে না অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৮ পয়সা,আগের হিসাব বছরে যা ছিল ১ পয়সা। ৩০ জুন ২০২৫ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ২৪ টাকা ৭৭ পয়সা। সম্প্রতিক সময়ে সবশেষ ২০২১-২২ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল কোম্পানিটি। আলোচ্য সময়ে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ইপিএস হয়েছিল ২০ পয়সা।

This will close in 5 seconds