ঋণের বিপরীতে অনেক বন্ধকি সম্পত্তি ভুয়া

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে রাখা বন্ধকি সম্পত্তির আর্থিক মূল্যায়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠানের হিসাবে দেখা যায়, প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে এসব সম্পত্তির বাজারমূল্য মাত্র ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এছাড়া তাৎক্ষণিক বিক্রয়মূল্য (ফোর্স সেল ভ্যালু) ধরা হয়েছে ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রচলিত নিয়মে ১০০ টাকার বন্ধকি সম্পত্তির বিপরীতে ব্যাংকগুলো সাধারণত ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়—ঋণ বিতরণের সময় এমন হিসাবই দেখানো হয়েছিল। তবে পরবর্তী যাচাইয়ে সার্ভেয়ার প্রতিষ্ঠান দেখতে পেয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য কয়েক গুণ বেশি দেখানো হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বন্ধক হিসেবে দেখানো সম্পত্তির অস্তিত্বই মিলেনি।

পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ব্যাংকের বন্ধকি সম্পত্তির বাস্তব অস্তিত্ব নেই। তাছাড়া ঋণের বড় অংশই বেনামি এবং সুবিধাভোগীরা পলাতক থাকায় নতুন করে বন্ধক গ্রহণ বা আদায় প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন করে তাদের কাছে সম্পদ হস্তান্তরের সুপারিশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা করে ফেরত দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকদের মাধ্যমে অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে আট লাখ ২২ হাজার গ্রাহককে তিন হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। আরও আট হাজার কোটি টাকার বেশি ফেরতের কার্যক্রম চলছে। একজন আমানতকারীর যত অর্থই জমা থাকুক, এ প্রক্রিয়ায় তিনি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাচ্ছেন। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অর্থের বাইরে এ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব ব্যাংকের সমপরিমাণ দায় কমে আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে গত এপ্রিল শেষে এক লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। মোট ঋণের যা ৮৬ শতাংশ। মোট আমানত কমে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ধার হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মূলধন হিসেবে সরকার এরই মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। অবশ্য ব্যাংকটির মোট মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থের মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের মধ্যে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ শেয়ার ইস্যু করা হবে। আর প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের দেওয়া হবে আরও সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার শেয়ার। এভাবে ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় চলার পর এক পর্যায়ে আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চার মাস আগে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ ছিল এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে ছিল এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর মানে ঋণ কমলেও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের মোট মূলধন ঘাটতির অর্ধেকের বেশি এই পাঁচ ব্যাংকে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল দুই লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ ছিল খেলাপি এবং মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় ২২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা; একীভূত হওয়ার আগে ব্যাংকটি নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল, আর বাকি চারটি ব্যাংক পরিচালিত হতো এস আলম গ্রুপের অধীনে। এসবের মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ, যেখানে ২৮ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণের ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশই খেলাপি এবং মূলধন ঘাটতি ২৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা; ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার ঋণের ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ খেলাপি, যার মূলধন ঘাটতি ৬৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা; গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকার ঋণের ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ খেলাপি, মূলধন ঘাটতি ১৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা; আর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩৮ হাজার ৩৮১ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে ৭৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি, যেখানে মূলধন ঘাটতি ২২ হাজার ১১৪ কোটি টাকা।