** আংশিক রেয়াতের নামে অবৈধভাবে রেয়াত নেয়া হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা; ইন্টারনেট বিল, কুরিয়ার সার্ভিস, প্রফেশনাল ফিস ও বিজ্ঞাপন খাতে অবৈধভাবে রেয়াত নেয় ব্র্যাক ব্যাংক
** বিভিন্ন কেনাকাটা বা ব্যয়ের উপর প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা উৎসে কর পরিশোধ করেনি
** স্থাপনা ভাড়ার উপর ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি, আবগারি শুল্ক কর্তন করেও পরিশোধ করেনি
আংশিক রেয়াতের নামে নেয়া হয়েছে আইন ও বিধি বর্হিভূত অবৈধ রেয়াত। কেনাকাটা বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি খাতে উৎসে কর কর্তন করা হলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। স্থাপনা ভাড়ার উপর সঠিকভাবে কর্তন করা হয়নি ভ্যাট। ব্যাংক লেনদেনে আবগারি শুল্ক কর্তন করা হলেও তা সঠিকভাবে জমা দেওয়া হয়নি। তৃতীয় প্রজন্মের ব্র্যাংক ব্যাংক পিএলসির বিরুদ্ধে এই অবৈধ রেয়াত নেয়া, উৎসে করফাঁকি, স্থাপনা ভাড়ায় ভ্যাট ফাঁকি ও আবগারি শুল্ক সঠিকভাবে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির বিরুদ্ধে অবৈধ রেয়াত গ্রহণ ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূসক। বারবার শুনানি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন পুনঃযাচাইয়েও ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ায় দলিলাদি যাচাই করে এই দাবিনামা জারি করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। তবে, ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষ থেকে অবৈধ রেয়াত গ্রহণ ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
এনবিআর সূত্রমতে, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ২০২২ সালের জানুয়ারি হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরের নিরীক্ষা করার উদ্যোগ নেয় এলটিইউ। এরই প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেয়া কাগজপত্র ও এলটিইউতে থাকা প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট রিটার্নসহ অন্যান্য দলিলাদি যাচাই করেন কর্মকর্তারা। ২০২৪ সালের ২৩ জুন নিরীক্ষা শেষে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এতে ব্যাংকটির কেনাকাটা বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩৬ টাকা উৎসে মূসক বা ভ্যাট ফাঁকি উঠে আসে। এছাড়া ১ কোটি ৩১ লাখ ৭৬ হাজার ৮৫৮ টাকা অবৈধ রেয়াত গ্রহণ, স্থাপনা ভাড়ায় ১৩ লাখ ২৯ হাজার ২৬৯ টাকা ভ্যাট ফাঁকি ও ১৪ হাজার ৬৬৬ টাকা আবগারি শুল্ক ফাঁকি বা অপরিশোধিতসহ মোট ৭ কোটি ৩ লাখ ৬ হাজার ৩২৯ টাকা ফাঁকি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন দাখিলের পরপরই প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়। তবে ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন খাতে অবৈধ রেয়াত, উৎসে ভ্যাট ও আবগারি শুল্কের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একইসঙ্গে পুন:পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দিতে এলটিইউতে আবেদন করা হয়। প্রতিষ্ঠানের আবেদন বিবেচনায় নিয়ে পুন:পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয় এলটিইউ। এতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে লিখিত জবাবও দেওয়া হয়। পুনঃপ্রতিবেদন মনোভূত না হওয়ায় দ্বিতীয়বার পুনঃপ্রতিবেদন দেওয়া হয়। অর্থাৎ দ্বিতীয়বার পুন:পর্যালোচনা প্রতিবেদন দেওয়া হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় পুন:পর্যালোচনা প্রতিবেদনে ফাঁকির পরিমাণ কমে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ৫৬ হাজার ১২৫ টাকাতে দাঁড়ায়।
এতে প্রিন্টিং, মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেট ও নবায়ন, কনভেন্স অ্যান্ড ট্রাভেলিং, কমিশন পেইড, ডোনেশন ও সাবক্রিপশন, ফার্নিচার ও ফিক্সার খাতে এলটিইউর হিসাব করা ভ্যাটের বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়। একইসঙ্গে কিছু প্রমাণও জমা দেওয়া হয়। আবার আংশিক রেয়াত গ্রহণ, স্থাপনা ভাড়া ও আবগারি শুল্কের বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়।
অবৈধ রেয়াত গ্রহণের বিষয়ে ব্যাংকের ব্যাখ্যায় বলা হয়, এনবিআরের ২০২০ সালের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যে সকল আয় আদার কম্প্রিহেনসিভ ইনকামের মাধ্যমে ইনকাম স্টেটমেন্ট আয় হিসেবে অন্তভূর্ক্ত হয় অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরাসরি ইনকাম স্টেটমেন্টে আয় হিসেবে অন্তভূর্ক্ত হয়, সে সকল আয়ের উপর মূসক প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ অর্থের লেনদেন, বিনিয়োগ হতে প্রাপ্ত লভ্যাংশের সুদ আয়, ঋণদানের বিপরীতে গৃহীত লভ্যাংশ বা সুদ এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন হতে উদ্ভূত অতিরিক্ত আয়কে মূসকের আওতা বর্হিভূত রাখা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিনিয়োগ হতে প্রাপ্ত লভ্যাংশ বা সুদ আয়, ঋণ প্রদানের বিপরীতে গৃহীত লভ্যাংশ বা সুদ এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন হতে উদ্ভূত অতিরিক্ত আয়সমূহ মূসক আইন অনুসারে সরবরাহ নয়। ফলে ধারা ৪৭ এর উপধারা ৩-এ বর্ণিত সূত্রটি প্রয়োগ করে আংশিক রেয়াত গ্রহণের জন্য অতিরিক্ত আয়সমূহ অন্তভূর্ক্ত হবে না। কেননা আংশিক রেয়াত গ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ব্র্যাক ব্যাংকের আর্থিক রেয়াত পরিগণনা করা সময় আইনগত কোন ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ হতে প্রাপ্ত লভ্যাংশ বা সুদ আয়, ঋণপ্রদানের বিপরীতে গৃহীত লভ্যাংশ বা সুদ এবং বৈদেশিক লেনদেন হতে উদ্ভূত অতিরিক্ত আয়সমূহকে ধারা ৪৭ এর উপধারা ৩-এর সূত্রের পরিগণনা করা সঠিক হয়নি। তবে এলটিইউ বলছে, আইনের ধারা ৪৭ এর উপধারা (৩) এবং বিধি-২৬ এর উপবিধি-১ অনুযায়ী হবে। প্রতিষ্ঠানটি মোট মূসকযোগ্য আয়কে মোট আয় দ্বারা ভাগ করে টি/এ এর ভগ্নাংশ ০ দশমিক শূন্য ৮২ হওয়ায় ব্র্যাক ব্যাংকের গৃহীত ১ কোটি ৩১ ণাখ ৭৬ হাজার ৮৫৮ টাকা রেয়াত বাতিলযোগ্য এবং প্রতিষ্ঠান থেকে আদায়যোগ্য। এই খাত ছাড়াও ব্র্যাক ব্যাংক ইন্টারনেট বিল, কুরিয়ার সার্ভিস, প্রফেশনাল ফিস ও বিজ্ঞাপন খাতে অবৈধভাবে রেয়াত নিয়েছে, যা বাতিলযোগ্য।
উৎসে মূসক বা ভ্যাট বিষয়ে বলা হয়েছে, ব্র্যাক ব্যাংক প্রিন্টিং খাত, রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স খাতের ট্রান্সপোর্ট খাত, ট্রাভেলিং অ্যান্ড কনভেয়ান্স খাত, কমিশন পেইড খাত, ডোনেশন অ্যান্ড সাবক্রিপশন খাত, ফার্নিচার ও ফিক্সারসহ বেশ কয়েকটি খাতে উৎসে মূসক কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়নি। যদিও প্রতিষ্ঠানটি উৎসে মূসক কর্তনকারী সত্ত্বা হিসেবে অন্তভূর্ক্ত।
এই বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক একটি কমপ্লায়েন্স ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। এমন কমপ্লায়েন্স ব্যাংকের কাছে অবৈধ রেয়াত গ্রহণ ও উৎসে মূসক ফাঁকি গ্রহণযোগ্য নয়। দুই, দুইবার যাচাই শেষেও ফাঁকি প্রমাণিত হয়েছে। ফাঁকির সঙ্গে সুদও গণনা করা হবে। শুধু ২০২২ সাল নয়, এর আগে এবং পরের বছরগুলোর ভ্যাট রিটার্নসহ কাগজপত্র যাচাই করলে ফাঁকির পরিমাণ অনেক বেশি হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
অপরদিকে, এই বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) এম মাসুদ রানা এফসিএ বলেন, আমরা পুরোপুরি কমপ্লায়েন্স। ভ্যাট অথরিটি যখন রিভিউ করে, তাদের কিছু বক্তব্য থাকে। এগুলো রেগুলার ফেনোমেনা। ভ্যাট অথরিটি বলে এটা হবে না। আমরা আমাদের যুক্ত দেয়, একক্সপ্লানেশন দেয়। যদি বনিবনা না হয় আমরা আপিল, ট্রাইব্যুনালে যাই। যদি ট্রাইব্যুনালেও আমরা না পাই, তাহলে হাইকোর্টে যাই। তবে এলটিইউ যে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করেছে সে বিষয়ে হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড ট্যাকসেশন সৈয়দ বশির আলী এফসিএ এর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। সৈয়দ বশীর আলী এফসিএ অবৈধ রেয়াত নেয়ার বিষয়ে বলেন, আমরা সবসময় পুরোপুরি রেয়াত নেয় না। ব্যাংক খাত বা সার্ভিস সেক্টর পুরো নেয় না। আমরা ভগ্নাংশ রেয়াতটা নেয়। ইনকামের উপর ভগ্নাংশ বের করে রেয়াতটা নেয়। এই বিষয়ে আমরা এনবিআরকেও বলার পর তারা পরবর্তী বছরগুলোতে ক্লারিফাই করে দিয়েছিল। আমরা ব্যাখ্যাও দিয়েছি। তারা বলছে, ব্যাখ্যা দেয়া লাগবে না। আমরা করে দেবো। এলটিইউ বলছে আপনারা আপিল করে আসেন। উৎসে ভ্যাট ফাঁকি বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা বেশ কিছু ডকুমেন্ট দিয়েছি। তারা বলছেন, দেরি হয়ে গেছে, এত ডকুমেন্ট দেখা সম্ভব না। সব খাত আমরা মানি নাই, ব্যাখ্যা দিয়েছি। আবগারি শুল্ক বিষয়ে তিনি বলেন, আবগারি শুল্ক কিভাবে বের করেছে দেখতে হবে। ফাঁকি, অবৈধ রেয়াত বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের সব ব্যাখ্যা যদি নেয়া হয়, তাহলে আমাদের কোন গ্যাপ থাকবে না।
অবৈধ রেয়াত, উৎসে ভ্যাট ফাঁকির বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তারেক রেফায়েত উল্লাহ খান বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক এমন একটি ব্যাংক, যারা অবৈধ কোন কাজ করে না। আমাদের ব্যাংক সবসময় সর্বোচ্চ ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করে। আপনি যে বিষয় বলেছেন, সেটা আমার জানা নেই।
** ব্র্যাক ব্যাংকের রেকর্ড নিট মুনাফা ১৪৩২ কোটি টাকা
** ব্র্যাক ব্যাংকের অনিয়ম: ৪ বছরে ছাঁটাই ২৬৬৮ কর্মী, বেশিরভাগ জোরপূর্বক
** আয়কর আদায়ে সহযোগিতা করে না ‘ব্র্যাক ব্যাংক’!
** ব্র্যাক ও আনসার-ভিডিপির এনআইডি সেবা বন্ধ
** ‘সেবা আমদানির’ নামে রাজস্ব ফাঁকি ১৮২৫ কোটি টাকা
