ঈদের পরই সরকারের সামনে বড় তিন চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যার প্রভাব কৃষি, শিল্প-কলকারখানা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও এখনও অনুকূলে নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। সব মিলিয়ে, ঈদের পর মাত্র এক মাস আগে গঠিত বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে নানামুখী চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশিলতা – মোটাদাগে এই তিনটিই সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।তারা বলছেন, দীর্ঘ দিনের একটি বিশেষ পরিস্থিতির পর দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মেটানোই নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি।এছাড়া, নির্বাচনের আগে সরকারি দল তাদের ইশতেহারে প্রত্যাশা পূরণে যেসব বার্তা দিয়েছে সেগুলো তারা কতটা ধারণ করতে পারে – সেদিকেও নজর থাকবে সাধারণ মানুষের।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনসহ নানা ইস্যু নতুন সরকারের সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ঈদের পর দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে যে কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে, তা স্বীকার করছেন সরকারের মন্ত্রীরাও। তারা জানিয়েছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে নতুন সরকার, ঈদের পর তার গতি আরও বাড়বে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনই এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ নিয়েই বেশি চিন্তা

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রায় এক মাস ধরে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতির কারণে এ মুহূর্তে গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের জন্যও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ঈদের আগে থেকেই সাধারণ মানুষ জ্বালানি সংকটের প্রভাব কিছুটা অনুভব করেছেন। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশে এপ্রিল-মে মাসে প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের চাহিদা এবং ফসল আবাদে জ্বালানির চাহিদা বড় চিন্তার কারণ হতে পারে বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলছেন, ঈদের পর অফিস-আদালত এবং শিল্প-কারখানাগুলো পূর্ণ শক্তিতে চালু হওয়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।এছাড়া কৃষি উৎপাদনে সার ও সেচের জন্য জ্বালানি তেলের চাহিদাও বাড়বে। এক্ষেত্রে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

রাজনীতির মাঠে যেসব চ্যালেঞ্জ

ঈদের পর দেশের রাজনীতির মাঠেও নতুন সরকারকে নানা সমীকরণের মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, বিরোধী দলের দাবি ও আন্দোলন, এমন নানা বিষয় ঈদের পরসরকারের সামনে খুব কম সময়ের মধ্যেই হাজির হবে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে সেগুলো সরকারে বসে দলটি কতটা ভুল প্রমাণ করতে পারবে সে প্রশ্ন রয়েছে।

রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, ‘স্থানীয় সরকার বা প্রশাসনে যেসব নিয়োগ হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি দলের লোক দিয়েই। এ ধরণের দলীয়করণ জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’ এছাড়া সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও জুলাই সনদ ইস্যুতে বিরোধী দলের দাবিদাওয়া ও আন্দোলনের মতো কর্মসূচিও সরকারকে চাপে ফেলতে পারে, বলছেন তিনি।

অর্থনীতি নিয়ে বাড়তি ভাবনা

এদিকে, অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সরকারের জন্য সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। দেশের অর্থনীতিতে আগে থেকেই নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। সেখানেএখন বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি সংকট আরও বাড়াতে পারে বলেই মত তাদের।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, অন্য সব পণ্যের মূল্য নির্ধারণের বড় নির্ণায়ক হলো জ্বালানি। তাই জ্বালানির দামে প্রভাব পড়া মানে সব পণ্যের দামই প্রভাবিত হবে। এছাড়া ঈদের পরেই নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সামনের অর্থ বছরের বাজেট। কেননা, নির্বাচনি ইশতেহারে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে বাজেটে কী বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে – এবার সেদিকে নজর থাকবে সাধারণ মানুষের।এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষার যেসব পদক্ষেপ স্বল্প পরিসরে সরকার ইতোমধ্যেই নিয়েছে সেগুলোও বাজেটে সম্প্রসারণ করতে হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ‘সরকার তো ইতোমধ্যেই বাজেট তৈরির কাজে হাত দিয়েছে। এই বাজেটে ব্যয়ের সঙ্গে রাজস্ব আয়ের সামঞ্জস্য করাটা তাদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জ হবে।’ কৃষি উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও ঈদের পর সরকারকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলবে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।