ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট গত মাসে সংসদে পাস হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বড়। নির্বাচনের আগে বিএনপির ইশতেহার ও রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায় আর্থিক ও রাজস্ব খাতে ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উচ্চাভিলাষী এই বাজেট বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কাঠামোগত সংস্কার অনিবার্য।
বিএনপির ৩১ দফার ১৪ নম্বর প্রস্তাবে বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, গবেষক, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, করপোরেট নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল মুক্তবাজার অর্থনীতির বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা দূর করা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রবৃদ্ধির সুফল সুষম বণ্টনের মাধ্যমে বৈষম্য কমানো। একই সঙ্গে ১২ নম্বর দফায় অর্থপাচার, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়; এতে গত দেড় দশকের অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে শ্বেতপত্র প্রকাশ, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আর্থিক তদারকি ব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বাজেটে নেই সুস্পষ্ট রোডম্যাপ
তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়নি। বাজেট বক্তৃতায় কেবল উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং করনীতি প্রণয়নে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হবে। কিন্তু এই পৃথকীকরণ কখন, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা হবে—এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি বা রূপরেখা দেওয়া হয়নি। বাজেট-পরবর্তী সময়ে এনবিআরের পুনর্গঠন নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতির কোনো তথ্য প্রকাশ পায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীর বার্তা
যদিও বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যাংকিং খাতে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বাজেটে ৩৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা ইকুইটি সহায়তা রাখা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একটি পরিবারের আধিপত্য ঠেকাতে আইন সংশোধন করা হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন বা পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে। একইসঙ্গে সরকার অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে, যাতে বেসরকারি খাত সহজে ঋণ পায়। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করা হবে, যাতে করপোরেট খাত ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে পারে। তার ভাষায়, আর্থিক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হবে ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ’-এর ভিত্তি।
সংস্কারের অভাবে আটকে যায় আইএমএফের কিস্তি
একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাত ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এ কাঠামোগত সংস্কারের ধীরগতির কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণ কর্মসূচির কিস্তি বিলম্বিত হয়েছে। ২০২৩ সালে অনুমোদিত ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এই কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ব্যাংকিং ও রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কার। ব্যাংক খাতে আইএমএফের প্রধান শর্ত ছিল খেলাপি ঋণ কমানো, সুদের হার বাজারভিত্তিক করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। তবে বাস্তবে খেলাপি ঋণ কমার বদলে বেড়েছে, আর পুনঃতফসিল ও ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করার প্রবণতা নিয়েও সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ও দুর্বল বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি ও প্রভিশন সংকট নিরসনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এনবিআর সংস্কারেও জোর আইএমএফের
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে। এ লক্ষ্যে সংস্থাটি এনবিআরের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম পৃথক করা, কর অব্যাহতি কমানো, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমস ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের সুপারিশ করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এসব সংস্কারের বড় অংশই এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ব্যাংক ও রাজস্ব প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি, যার প্রভাব পড়েছে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির বাস্তবায়নেও।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল বাজেটে বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; ব্যাংক, রাজস্ব প্রশাসন ও আর্থিক খাতের গভীর কাঠামোগত সংস্কারের জন্য সুস্পষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
