ইপিএ সই: গাড়ি শিল্পে জাপানের বড় বিনিয়োগের লক্ষ্য

বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট-ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে। সরকার এটিকে কেবল বাণিজ্য সম্প্রসারণের দলিল হিসেবে নয়, বরং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর শিল্পায়ন কৌশলের মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখছে। চুক্তির মাধ্যমে বড় পরিসরে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণই প্রধান লক্ষ্য।চুক্তির আওতায় তৈরি পোশাকসহ ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবেও। তবে জাপান থেকে আমদানিকৃত গাড়ি এই সুবিধার আওতায় আসছে না। তবু জাপানি গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পে বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা পাবে।

গতকাল শুক্রবার টোকিও সময় বিকাল ৩টায় বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশীরউদ্দিন ও জাপানের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হোরিই ইওয়াও বাংলাদেশ–জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এবং উভয় দেশের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাণিজ্য উপদেষ্টা এক বিবৃতিতে বলেন, ইপিএ শুধু একটি বাণিজ্যিক দলিল নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পথনকশার অংশ। চুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি ও লজিস্টিক খাতে জাপানি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে এটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাপান এলডিসি দেশগুলোর জন্য ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশ শুল্ক লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক খাদ্য (মাছ ও চিংড়ি), হোম টেক্সটাইলস, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কৃষিপণ্যসহ ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য রয়েছে। ইপিএর মাধ্যমে এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের এই সুবিধা বহাল থাকবে। তবে চাল, চিনি, মৎস্যপণ্য এবং চামড়া ও চামড়াসহ ১৯৭টি ট্যারিফ লাইনের পণ্য এই সুবিধার বাইরে থাকবে।

চুক্তিতে পোশাক খাতে ‘সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন’ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকায় এখন থেকে কাঁচামাল নিয়ে কোনো জটিলতা ছাড়াই বাংলাদেশি পোশাক জাপানে সহজে রপ্তানি করা যাবে। একই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের বাজারে যন্ত্রপাতি ও মেকানিক্যাল ডিভাইস, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ইস্পাত ও লোহাজাত পণ্য, রাসায়নিক পদার্থ, প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্য এবং গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশসহ ১ হাজার ৩৯টি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। জাপান এই সুবিধা ধাপে ধাপে ১৫ বছরে প্রয়োগ করবে। ইপিএর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত দিক হলো—জাপান থেকে আমদানিকৃত সম্পূর্ণ প্রস্তুত গাড়ি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। চুক্তির নথিতে বলা হয়েছে, অটোমোবাইল বা গাড়ি শিল্প খাতে এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় বাজারকে আমদানিনির্ভর না করে উৎপাদনমুখী করা এবং জাপানি নির্মাতাদের বাংলাদেশে গাড়ি সংযোজন ও উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা।

নথিতে উল্লেখ রয়েছে, টয়োটা, হোন্ডা ও নিসানের মতো জাপানি ব্র্যান্ডগুলোকে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, যৌথ উদ্যোগ বা অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট গড়তে উৎসাহিত করাই সরকারের লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে জাপানি বিনিয়োগকারীদের প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। এর ফলে জাপানের বাজারে বিদ্যমান একতরফা শুল্কমুক্ত সুবিধা ঝুঁকির মুখে পড়বে। নথিতে বলা হয়েছে, ইপিএতে গৃহীত কৌশল বাংলাদেশের এলডিসি-পরবর্তী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় পণ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে। জাপানের আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, শিক্ষা, কেয়ারগিভিং ও নার্সিংয়ের মতো প্রায় ১৬টি বিভাগে ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশের দক্ষ পেশাজীবীরা কাজ করার সুযোগ পাবেন। এতে জাপানে দেশের মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাপানের জন্য ১২টি বিভাগের ৯৮টি উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। সেবা খাতের এই সুযোগকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের নার্স, ডাক্তার, আইটি ও অন্যান্য সেক্টরে দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, চুক্তিতে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, শুল্ক, বিনিয়োগ, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং মেধাস্বত্বসহ (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশই প্রথম জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষর করেছে। সরকার মনে করছে, চুক্তি শুধুমাত্র বাণিজ্য নয়, বরং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমবে এবং জাপান বাংলাদেশের বড় বাজারে পরিণত হবে।

** ৭,৩৭৯ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ