ইউটিউব দেখে কালো ধান চাষে সফল কৃষক

ইউটিউব দেখে নতুন জাতের ধান চাষে অনুপ্রাণিত হয়ে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সাহারবাটি কলনিপাড়া গ্রামের কৃষক শাবান আলী এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রচলিত ধানের বাইরে গিয়ে তিনি মাত্র এক বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্ল্যাক রাইস চাষ করে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফলতা অর্জন করেছেন। কম খরচ, তুলনামূলক কম পরিচর্যা এবং বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে এই ধান এখন স্থানীয় কৃষকদের কাছে ব্যাপক আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।

কৃষক শাবান আলী জানান, ইউটিউবের ভিডিও দেখে তিনি প্রথম ব্ল্যাক রাইস চাষ সম্পর্কে ধারণা পান। পরে অনলাইনের মাধ্যমে দুই কেজি বীজ ১২শ টাকায় কিনে ঝুঁকি নিয়ে অল্প জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন। ফলন ও বাজারমূল্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর তিনি এখন বেশ সন্তুষ্ট। তিনি জানান, তার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক কৃষক আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তারা ইতোমধ্যে তার কাছে এই জাতের ধানের বীজ নেওয়ার জন্য অগ্রিম যোগাযোগ করছেন। শাবান আলী আরও জানান, অন্যান্য ধানের তুলনায় এই ধানে সার ও সেচ কম লাগে। তিনি এ পর্যন্ত মাত্র দুইবার সার প্রয়োগ করেছেন, তাতেই ফলন বেশ ভালো হয়েছে। তার আশা, এক বিঘা জমিতে প্রায় ২০ মণ ধান পাওয়া যাবে। আর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ধান কাটা ও মাড়াইয়ের উপযোগী হয়ে উঠবে। তিনি আরও বলেন, এ জাতের ধানের বাজারমূল্য তুলনামূলক ভালো বলে জেনেছেন। সঠিক দামে বিক্রি করতে পারলে ভালো লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে তিনি আরও বেশি জমিতে ব্ল্যাক রাইস চাষ করার পরিকল্পনা করছেন।

গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জুয়েল রানা জানান, প্রায় তিন বছর আগে ঢাকার একটি খামার থেকে জোড়পুকুর গ্রামের কাজল প্রথমবার এ জাতের ধানের বীজ সংগ্রহ করে চাষ শুরু করেন, যার ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে গাংনী উপজেলায় এ ধানের আবাদ ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আরও জানান, গত বছর তার মামা চেংগাড়া গ্রামের জুবায়ের হোসেন আড়াই বিঘা জমিতে ব্ল্যাক রাইস চাষ করে বিঘাপ্রতি ১৬ থেকে ১৭ মণ ফলন পান। উৎপাদিত ধান থেকে চাল তৈরি করে প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় এবং ধান প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এদিকে শাবান আলীর সফলতা দেখে আশপাশের কৃষকরাও এ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

একই মাঠের কৃষক আশরাফ হোসেন বলেন, শাবান ভাইয়ের জমিতে ভালো ফলন দেখে আমরা অবাক হচ্ছি। সাধারণ ধানের তুলনায় শুনছি এ ধান চাষে খরচ কম লাগছে, আর বাজারে দামও অনেক ভালো। যদি শাবান ভাই লাভবান হন। তাহলে আমরা অবশ্যই আগামী মৌসুমে ব্ল্যাক রাইস চাষ করব।আরেক কৃষক ডাবলু জানান, আমরা আগে এই ধানের ব্যাপারে তেমন জানতাম না। এখন শাবান আলীর কারণে জানতে পেরেছি। তার জমির ফলন দেখে আমরা উৎসাহিত হয়েছি। যদি সরকারিভাবে সহযোগিতা পাওয়া যায়, তাহলে আমরা বড় পরিসরে এই ধান চাষ করতে চাই।

গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসার মতিয়র রহমান বলেন, ব্ল্যাক রাইস চাষের মূল কারণ হচ্ছে এর উচ্চ বাজারমূল্য। সাধারণ ধানের তুলনায় এর দাম অনেক বেশি এবং নির্দিষ্ট কিছু ভোক্তা শ্রেণির কাছে এর আলাদা চাহিদা রয়েছে।তিনি আরও জানান, ব্ল্যাক রাইস পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে এ ফসলের বাজার আরও সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মেধা জানান, মেহেরপুর সদর ও গাংনী উপজেলায় বর্তমানে মোট দুই বিঘা জমিতে কালো ধানের আবাদ হয়েছে। এই ধানের বাজার যদি ভালো থাকে এবং চাষিরা লাভবান হন, তাহলে জেলার অন্যান্য কৃষকদের এ জাতের ধান চাষে উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও কৃষকদের আগ্রহ অব্যাহত থাকলে, মেহেরপুরসহ আশপাশের এলাকায় ব্ল্যাক রাইস চাষ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।