Header – After

আলমাস শিমুলের বিরুদ্ধে মামলা চলতে বাধা নেই

২০১৯ সালে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুলসহ তিনজনকে আসামি করে চট্টগ্রাম বন আদালতে মামলা দায়ের করে। অভিযোগ ছিল, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে অবৈধ পাহাড়কাটা, ছড়ার মুখে বাঁধ নির্মাণ, পানি প্রবাহ বন্ধ করা, ছড়ার গতিপথ পরিবর্তন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন ও পরিবেশ-বৈচিত্র্যের ক্ষতি। চার বছরেও মামলাটি স্থির হয়নি। এই সময় অভিযোগ সংশোধন, আসামির অব্যাহতি, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ও আপস-মিমাংসা ইত্যাদি নানা জটিলতা পেরিয়েছে। এখন অবশেষে আলোচিত মামলাটি বিচার কার্যক্রমের জন্য আলোর মুখ দেখছে।

গত বছরের ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন আদালত জিপিএইচ ইস্পাতের মালিক আলমাস শিমুল ও দুই অন্য আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে, ১৯২৭ সালের বন আইনের ৩৩(১)(গ) ধারায়। পরে ৩১ অক্টোবর তারা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করে। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি আদালত সেই রিভিশন মামলা খারিজ করলে বন আদালতে মামলা চালু হওয়ার পথে আর কোনো বাধা রইলো না। জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে ফেরত আসলেই মামলার বিচার শুরু হবে।

মামলার আসামিরা হলেন- সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের কাজীপাড়া এলাকার মৃত ছালেহ আহম্মদের ছেলে মো. লিটন (৪০), একই এলাকার মৃত দিদারুল ইসলামের ছেলে মো. আলমগীর (৩২) ও নগরীর ফয়েজলেক লেকভ্যালি আবাসিক এলাকার মৃত ইদ্রিস আলীর ছেলে জিপিএইচ ইস্পাতের মালিক আলমাস শিমুল (৫২)। এ মামলার সাক্ষী ৪ জন। এরা হলেন, মামলার বাদী ফরেস্টার বিভাষ কুমার মালাকার, বনপ্রহরী এইচ এম নুরুল ইসলাম, মো. আব্দুল মালেক, মো. ওমর ফারুক।

২০১৯ সালে বন বিভাগের তৎকালীন ফরেস্টার বিভাষ কুমার মালাকার আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে অভিযোগ আনা হয়, জিপিএইচ ইস্পাত পরিবেশ ধ্বংস করে পাহাড় কেটে মাটি অপসারণ ও ছড়ায় লম্বা বাঁধ তৈরি করেছে, যার ফলে ছড়ার প্রবাহ পরিবর্তিত হয়েছে এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, এই কাজ এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। মামলার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৬৫ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। চার্জশিটে ১৫ হাজার ১৭৫ ঘনফুট পাহাড় কাটা ও বাঁধ নির্মাণের সত্যতা উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলাটির এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল বেলা আনুমানিক এগারোটায় সীতাকুণ্ডের জঙ্গল বাঁশবাড়িয়া মৌজার আরএস দাগ নম্বর ৬২০ ও তৎসংলগ্ন পাহাড়ি ছড়া এলাকার পাহাড়ে বন বিভাগের ফরেস্টার বিভাষ কুমার মালাকার ও সাক্ষী আরও তিন বনপ্রহরী পরিদর্শনে যান। ওই এলাকাটি গেজেট নোটিফিকেশন অনুসারে ৭ জুন ১৯৩৫ সাল মূলে বন বিভাগের সংরক্ষিত বনভূমি এলাকা। এলাকাটির পশ্চিমে জিপিএইচ ইস্পাতের বিশাল কারখানার অবস্থান। তবে কারখানার পূর্বে অবস্থিত সংরক্ষিত বনে সর্বসাধারণের সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ নিষিদ্ধ। ওইদিন পরিদর্শনে বন কর্মকর্তারা দেখতে পান যে, ১৫০-২০০ জন পুরুষ ও নারী শ্রমিক অবৈধভাবে পাহাড় কেটে পাহাড়ি বারোমাসি ছড়ার মুখে বাঁধ নির্মাণ করে পশ্চিম দিকে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এসময় বন কর্মকর্তারা ঘটনার স্থিরচিত্র তুলে নেন এবং শ্রমিকদের কাছে জানতে চান কার নির্দেশে তারা বাঁধ নির্মাণের কাজ করছেন।

এসময় উত্তরে শ্রমিকরা জানান যে, তারা জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাজ করছে। পরক্ষণে জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃপক্ষের কারা কাজের নির্দেশ দিয়েছেন বা তাদের নাম কী জানতে চাইলে অজ্ঞাত পরিচয়ে দুইজন লোক ধারালো দা হাতে নিয়ে এসে সরকারি কাজে বাধা প্রদান করেন এবং বন বিভাগের লোকজনকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি প্রদান করে। এমন সময় জনবল কম হওয়ায় এবং অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে বন বিভাগের লোকেরা স্থান ত্যাগ করেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।

পরদিন ৪ এপ্রিল রেঞ্জ কর্মকর্তাসহ বনকর্মীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলে শ্রমিকরা বাঁধ নির্মাণ ছেড়ে সকল যন্ত্রপাতি নিয়ে গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যায়। বহু খোঁজাখুঁজি সত্ত্বেও তাদের পাওয়া যায়নি। বনকর্মীরা ঘটনার ছবি তোলেন, ১০টি খালি বস্তা আলামত হিসেবে সংগ্রহ করেন এবং ছড়ায় নির্মিত বাঁধ ও কাটা পাহাড়ের পরিমাণ পরিমাপ করেন। তদন্তে জিপিএইচ ইস্পাতের মালিক আলমাস শিমুল ও জাহাঙ্গীর আলমের নাম উঠে আসে এবং তাদের বিরুদ্ধে ৭ এপ্রিল উত্তর বন বিভাগের পক্ষ থেকে আদালতে অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগ দায়েরের পরও তারা শ্রমিক দিয়ে পাহাড় কেটে বাঁধ নির্মাণ অব্যাহত রেখেছিল।

এজাহার সূত্রে আরও বলছে, অভিযোগের অধিকতর তদন্তে জানা যায়, ৭ এপ্রিল দাখিলকৃত অভিযোগে ১ নম্বর আসামি আলমাস শিমুল ও ২ নম্বর আসামি জাহাঙ্গীর আলম ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। ঘটনার দিন অজ্ঞাত পরিচয়ে বন কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকিদাতা দুইজনের পরিচয় মেলায় ৮ এপ্রিল আদালতে সংশোধিত অভিযোগ দাখিল করে বন বিভাগ। এতে পূর্বের অভিযোগের ১ নম্বর আসামীকে ৩ নম্বর আসামি এবং ২ নম্বর আসামিকে ৪ নম্বর আসামি করা হয়। অন্যদিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি প্রদান এবং সরকারি কাজে বাধাদানকারী লিটন ও আলমগীরকে যথাক্রমে ১ ও ২ নম্বর আসামি করা হয়। আরও অধিকতর তদন্তে জানা যায় যে, ৭ এপ্রিলের ২ নম্বর ও ৮ এপ্রিলের সংশোধিত অভিযোগের ৪ নম্বর আসামীর (জাহাঙ্গীর) ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। ফলে উক্ত আসামিকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, পাহাড়কাটা ও পাহাড়ি ছড়ায় প্রবহমান পানি চলাচল বন্ধ করে বাঁধ নির্মাণ করায় একদিকে প্রাকৃতিক জলধারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি দিকে পানির স্তর বেড়ে বিস্তীর্ণ নিচু জমির বন ও বনভূমি পানির নিচে তলিয়ে যাবে। অন্যদিকে পানির অভাবে খরা দেখা দিয়ে পাহাড়ি গাছপালার ব্যাপক ক্ষতিসাধন হবে। ফলে ভূমির রূপবৈচিত্র্য পরিবর্তন হয়ে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। সংরক্ষিত বনভূমিতে অনুপ্রবেশ করে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালানোয় ১৯২৭ সনের বন আইনের ৩৩ এর ১ (গ) ধারায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে মর্মে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।