মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র টেকনাফ স্থলবন্দর গত ৯ মাস ধরে কার্যত অচল। নাফ নদের মিয়ানমার অংশে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) দাপটের কারণে বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সরকার ৪০০–৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। বন্দরের সরাসরি ক্ষতি প্রায় ৩ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
সীমান্ত সংক্রান্ত সূত্র জানিয়েছে, প্রায় দেড় বছর ধরে চলমান যুদ্ধে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে নাফ নদের মিয়ানমার অংশে নৌযান চলাচলও গোষ্ঠীটি নিয়ন্ত্রণ করছে। কমিশন না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে আরাকান আর্মি মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে সীমান্ত বাণিজ্য কার্যত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। এতে শতাধিক আমদানি-রপ্তানিকারক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। টেকনাফ স্থলবন্দর কাস্টমস ও ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ১২ এপ্রিল আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত মংডু এলাকা থেকে দুটি কাঠের বোট বন্দরে আসে। এর আগে ১৬ জানুয়ারি ইয়াংগুন থেকে টেকনাফে আসা পণ্যবাহী তিনটি বোট তল্লাশির অজুহাতে আরাকান আর্মি আটকে দেয়।
গত ২৪ ডিসেম্বর সরেজমিনে দেখা গেছে, টেকনাফ স্থলবন্দর বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জনশূন্য। কোনো পণ্য মজুদ নেই, শ্রমিক বা ব্যবসায়ীর আনাগোনা নেই। একসময় যেখানে শত শত ট্রাক ও সারি সারি কার্গোবোট ভিড়ত, সেখানে এখন তালাবদ্ধ গুদাম ও ফাঁকা ঘাট দেখা যাচ্ছে। পুরো এলাকায় ২৫–৩০টি ছাগল বিচরণ করছে। বন্দরের গেটে দায়িত্বে থাকা এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ৯ মাস ধরে এভাবেই একা দাঁড়িয়ে আছি। বলতে গেলে বন্দরে এখন ছাগল পাহারা দেওয়াই আমাদের কাজ। এই পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ অন্তত ২০ কর্মীকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ থাকার কারণে ৯ মাস ধরে স্থলবন্দরে রপ্তানিকৃত মালপত্রে পচন ধরেছে। এতে ব্যবসায়ীদের কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। এক্সপ্রেস এজেন্সির প্রতিনিধি মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, আরাকান আর্মির কারণে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। গুদামে কোটি টাকার মালপত্র পচে যাচ্ছে। তা ছাড়া শ্রমিকসহ আমাদের অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
আরাকান আর্মির বাধায় মিয়ানমার থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এতে মাসে বন্দরে লোকসান হচ্ছে ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া এই বন্ধের সময় ১৫ কোটি টাকা আয় থেকে ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের টেকনাফের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘৯ মাস ধরে সীমান্ত বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ থাকায় আমাদের মাসে ৩০ লাখ টাকা করে প্রায় তিন কোটি টাকার লোকসানের মধ্য রয়েছি। তাছাড়া বন্ধের সময় আমরা ১৫ কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’
কাস্টমস ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত সংক্রান্ত জটিলতার কারণে স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি চালু করা যাচ্ছে না। যার ফলে ৯ মাস ধরে পণ্যবাহী কোনো ট্রলার মিয়ানমার থেকে আসেনি। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মিয়ানমার থেকে এসেছে এক লাখ ৯৯ হাজার ২২৫ টন পণ্য, রাজস্ব আদায় হয় ৪০৪ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয় ৭৮ হাজার ৫২৭ টন, রাজস্ব আসে ৬৪০ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয় ১৫ হাজার ৭৫৭ টন, রাজস্ব আসে ১০৮ কোটি টাকা।
** টেকনাফ স্থলবন্দর স্থবির, দেউলিয়ার পথে ব্যবসায়ীরা
** মিয়ানমার থেকে পণ্য আসছে না টেকনাফ স্থলবন্দরে
** মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ
** মিয়ানমার থেকে পণ্য আসছে না টেকনাফে
** দিনমজুর নুরুল এখন ৪৫০ কোটি টাকার মালিক!
** আইনগত ত্রুটির কারণে হচ্ছে রাজস্ব ফাঁকি

