আগামী ২ বছর বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না সরকার

আগামী দুই বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না, বরং সিস্টেম লস ও চুরি কমিয়ে বিদ্যুতের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। রোববার বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিদ্যুৎ বিভাগের এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিদ্যুৎ খাতের লোকসান মোকাবিলায় এ বছর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ৪২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়ে আবেদন করেছে। বৈঠকে জানানো হয়েছে, ভর্তুকির বাইরে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ও জরুরি, কারণ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিতরণে খরচ পড়ে ১২.৯৭ টাকা, বিক্রি হয় মাত্র ৭ টাকায়। গত বছর ভর্তুকি সাপেক্ষেও পিডিবি ১৭ হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে। এছাড়া রমজানে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রমজান ও সেচ সামাল দিতে এখনই পিডিবির প্রয়োজন চার হাজার কোটি টাকা, নতুবা চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে যাবে।

বৈঠক শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার আপাতত বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না। তার পরিবর্তে সিস্টেম লস কমাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এখন বিদ্যুতের সিস্টেম লস হচ্ছে ৭ শতাংশের বেশি। এটি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে সরকারের সাশ্রয় হবে ১০ হাজার কোটি টাকা।’ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম সুমিত, বিদ্যুৎ সচিব, পিডিবির চেয়ারম্যানসহ বিদ্যুৎ খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নতুন সরকার আপাতত বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চাচ্ছে না। অন্য কোনো উপায়ে বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা করা হবে।’

পিডিবি নতুন মন্ত্রীদের জানিয়েছে, আদানি থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয় করছে ১৪.৮৬ টাকা, আরপিজিসিএল থেকে ২৬.৯২ টাকা, আরএনপিএল থেকে ১৫.৭০ টাকা, আশুগঞ্জ থেকে ৬.২৬ টাকা, ইজিসিবি থেকে ৬.৩৭ টাকা, এনডাব্লিউপিসিসিএল থেকে ১১.২২ টাকা এবং পায়রা থেকে ১৪.২৭ টাকায়। পিডিবির নিজস্ব উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৮.৯৬ টাকা। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ কিনে সরবরাহ করতে খরচ পড়ে গড়ে ১২.৯৭ টাকা প্রতি ইউনিট, কিন্তু বিক্রি হয় মাত্র ৭ টাকায়, ফলে প্রতি ইউনিটে লোকসান ৫.৯৭ টাকা। পিডিবি জানায়, গত বছর ৫৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান হলেও অন্তর্বর্তী সরকার ৩৮,৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। বাকি ১৭,০২১ কোটি টাকা এক বছরের লোকসান পিডিবির ওপর পড়ে গেছে। বর্তমানে পিডিবির জমে থাকা মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকায়।

পিডিবি আরও জানিয়েছে, ২০২১-২০২২ সালে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির জন্য ৩১,১৪৮.৩৪ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল, যেখানে দেওয়া হয়েছে ২৯,৬০৯.১৪ কোটি টাকা। ২০২২-২০২৩ সালে ভর্তুকির চাহিদা ছিল ৪৩,৫৯১ কোটি টাকা, দেওয়া হয়েছে ৩৮,৫৫০ কোটি টাকা। ২০২৩-২০২৪ সালে চাওয়া হয়েছিল ৪০,২৭৩ কোটি টাকা, দেওয়া হয়েছে ৩৩,০০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২০২৫ সালে ভর্তুকির চাহিদা ছিল ৪৩,১৭০ কোটি টাকা, দেওয়া হয়েছে ৩৮,৬৩৬ কোটি টাকা। চলতি বছরে ৩৬,৪৬১ কোটি টাকার ভর্তুকির জন্য আবেদন করা হয়েছে, যার মধ্যে অর্থমন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত ২০,২৯৮ কোটি টাকা দিয়েছে। চলতি বছরের লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট এবং ইউনাইটেড ৪৯০ মেগাওয়াট কেন্দ্র উৎপাদনে আসছে, যার ক্যাপাসিটি চার্জসহ অন্যান্য খরচ দিতে হবে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট, এর মধ্যে গ্যাস থেকে উৎপাদনের সক্ষমতা ১২,৪৭২ মেগাওয়াট।

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস বরাদ্দ দিন দিন কমাচ্ছে পেট্রোবাংলা। ২০২৪ সালের এপ্রিলে সর্বোচ্চ ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ঘনফুটের বেশি গ্যাস দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। সেই বরাদ্দ এখন ৭ কোটি ৬৭ লাখ ঘনফুটে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের স্বল্পতা, আর্থিক সংকট, নিরবচ্ছিন্ন কয়লা সরবরাহ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।