আড়াই বছরের নুসাইবা সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাকে আইসিইউতে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, কিন্তু অপেক্ষমাণ তালিকায় তার নাম ছিল ২২ নম্বরে। ‘সিরিয়াল’ আসার আগেই ১২ মার্চ শিশুটি মারা যায়। চার দিন পর আইসিইউ কর্মীরা ফোন করে সিরিয়াল আসার কথা জানান। নুসাইবা পাবনার চাটমোহর উপজেলার কাঠেংগা গ্রামের সবুজ আলীর ছেলে। রামেক হাসপাতালে ১১ থেকে ২২ মার্চের মধ্যে আইসিইউর জন্য অপেক্ষায় থাকা ৩৩ শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। বুধবার সকাল পর্যন্ত ৩৮ জন শিশু আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষমাণ ছিলেন।
রাজশাহী নগরের তেরখাদিয়া এলাকার বাসিন্দা সাহিদের ছেলে নাহিদ ১৩ মার্চ রামেক হাসপাতালে মারা যায়। বাবা জানান, চিকিৎসকের পরামর্শের তিন দিন পরও তিনি ছেলেকে আইসিইউতে নিতে পারেননি। রামেক আইসিইউর ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল মনে করেন, এই তিন দিনে আইসিইউ সেবা পেলে ৩৩টি শিশু বেঁচে যেত। ১৯ মার্চ সকালে একটি শিশু মারা গেছে, সে অপেক্ষমাণ তালিকার ৩৭ নম্বরে ছিল। তার মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, এত তদবির করেও আমার বাচ্চাকে আইসিইউ বেড দেওয়া হয়নি, বেড পেলে বাচ্চাটা বাঁচত।
অভিভাবকদের কাছ থেকে প্রায়ই ফোনে এ রকম ‘অভিশাপ’ পেতে হচ্ছে মন্তব্য করে আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের সরকারি হাসপাতালের মধ্যে একমাত্র রাজশাহীর এই ডেডিকেটেড ১২ শয্যার শিশু আইসিইউ। তা-ও চলছে বিশেষ ব্যবস্থায়। ১৯ মার্চ সর্বশেষ সিরিয়ালের রোগীর ঠিকানা ছিল রাজবাড়ী। তার মানে ঢাকা বিভাগের রোগীও একটা আইসিইউ শয্যার জন্য এখানে চলে আসছে।’
জটিল, সংকটাপন্ন ও মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসার জন্য আইসিইউ অপরিহার্য। সরকারি প্রতিষ্ঠানে খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি আইসিইউ সেবা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য দায়বদ্ধ নয়। সরকারি ও বেসরকারি আইসিইউ উভয়ই সহজে পাওয়া যায় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘হেলথ বুলেটিন ২০২৩’ অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে সরকারি উদ্যোগে ৭২৮টি নতুন আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হয়েছে। তবে দেশের মোট আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ওই বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়নি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ৬০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের বৃহত্তম আইসিইউ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শয্যা ৪০ ও শিশুদের ২০টি। কিন্তু এটি সরকারের অনুমোদন পায়নি। চলছে হাসপাতালের নিজস্ব উদ্যোগে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থায় প্রাপ্তবয়স্কদের ৪০টি শয্যার মধ্যে যুবকদের ১২টি, বয়স্কদের জন্য ১৬ ও ১২টি শয্যা শিশুদের জন্য ব্যবহার করছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল সরবরাহ না করায় শিশুদের ২০টি শয্যা চালু করা যাচ্ছে না। কিন্তু শিশুদের আইসিইউর চাহিদা অনেক বেশি।
রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম জানান, বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেলে ৪০ শয্যার আইসিইউ চলছে, তবে এটি সরকার অনুমোদিত নয় এবং হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। সরকার এখানে কোনো কর্মী নিয়োগ দেয়নি। নগরের লক্ষ্মীপুর এলাকায় ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে, যার ১০ শয্যায় শিশু আইসিইউ আছে। ২০২৩ সালে নির্মাণ শেষ হলেও হাসপাতাল হস্তান্তর ও জনবল কাঠামো অনুমোদন হয়নি। রামেক আইসিইউর ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, শিশু হাসপাতাল ও আইসিইউর অবকাঠামো প্রস্তুত, শুধু প্রয়োজন সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছা।
