হাম আক্রান্ত চার শিশুকে গত বৃহস্পতিবার শিশু ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনজনই মারা গেছে। বেঁচে থাকা শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে শনিবার বিকেলে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। একই দিনে আরও তিন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। চলতি মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পরও ৯ জনকে বাঁচানো যায়নি। তবে সাধারণ ওয়ার্ডে থাকা রোগীদের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হাম রাজশাহী অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ ১৫৩টি নমুনা পরীক্ষায় ৪৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা প্রায় ২৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনায়। ১ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজশাহীতে ৮৪ জন রোগীকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়; তাদের মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পর ৯ জন এবং অপেক্ষমাণ অবস্থায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাবনায় আজ সকাল পর্যন্ত ২৬ শিশু ‘হাম ওয়ার্ডে’ চিকিৎসাধীন থাকলেও সেখানে মৃত্যুর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আজ সকালে সেখানে হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৭০ শিশু।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের কনসালট্যান্ট মাহফুজ রায়হান জানান, আজ সকালে ৭০ শিশু হাম ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। বিকেলে ছুটি দেওয়ার পর প্রায় ৫০ শিশু ছিল। তিন মাসে চারজন মারা গেছে। তাদের মধ্যে চলতি মাসেই দুজন মারা যায়। তিন মাস ধরে তাঁরা আলাদা ওয়ার্ডে রেখে শিশুদের চিকিৎসা দিচ্ছেন।
রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত যে চার শিশুকে বৃহস্পতিবার আইসিইউয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে জহির ও হুমায়রা গতকাল শুক্রবার সকালে মারা গেছে। আরেক শিশু হিয়ার খোঁজ নিতে তার বাবা রিফাতকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘আর খোঁজ নিয়ে কী হবে ভাই, যার খোঁজ নেওয়া, সেই তো আর নাই।’ অন্য শিশু জান্নাতুল মাওয়ার বাবা হৃদয় আজ বিকেলে বলেন, তাঁর মেয়েকে আজ আইসিইউয়ে নেওয়া হয়েছে।
একটি বিশেষ পত্রিকায় ‘রাজশাহী মেডিকেল/ছোঁয়াচে হামের রোগীদের রাখা হয়েছে সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর চিকিৎসকদের নিয়ে সকালে একটি বৈঠক করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বৈঠকের বিষয়ে জানতে শিশু বিভাগের প্রধান শাহিদা ইয়াসমিনকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে এসব ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক স্যার নিজেই কথা বলবেন।’
হাসপাতালের পরিচালক ফোনে সাড়া না দেওয়ায় হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকার কারণে রোগীদের সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, যদিও আলাদা ওয়ার্ড তৈরি করা সম্ভব হয়নি, তবুও ২৪ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার করা হয়েছে, যেখানে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিকেলে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে এমন কোনো কর্নার দেখা যায়নি। তবে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ডায়রিয়া ও ডেঙ্গু কর্নারের পাশে ইংরেজিতে ‘হাম কর্নার’ লেখা দুটি কাগজ সাঁটানো ছিল। ভেতরে দুই পাশে পাঁচটি করে মোট ১০টি শয্যা রয়েছে। রোগীদের অবস্থা জানতে চাইলে কয়েকজন স্বজন জানিয়েছেন, তাদের শিশুদের ডায়রিয়া হয়েছে।
২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় একটি শয্যায় নিজের শিশুকে রেখে চিকিৎসা করাচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বারোরসিয়া গ্রামের মোহাম্মদ ওয়াসিম। তিনি বলেন, তিন দিন আগে হাসপাতালে আসার সময় তাঁর শিশুর এই সমস্যা ছিল না; ঠান্ডা, জ্বর ও নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে এখানে এসে জানতে পারেন, শিশুটি হাম আক্রান্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নার্সদের কাছ থেকে জেনেছেন এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ এবং এ ধরনের আরও অনেক শিশু একই ওয়ার্ডে ভর্তি আছে। আজ সকালে যে তিন শিশুকে আইসিইউয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে চারঘাটের কুলসুম আক্তার রাফিয়ার টিকার কার্ডে দেখা যায়, ৯ মাস বয়সে দেওয়ার কথা থাকা হামের টিকার কোনো উল্লেখ নেই। তবে ৯ মাসের আগেই অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, তিনি পরিস্থিতি পর্যালোচনায় পাবনায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে পরিস্থিতি বেশি গুরুতর। পাবনা সদর হাসপাতালে আজ ২৬ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল এবং তাদের আলাদা ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মৃত্যুর বিষয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য তিনি দিতে পারেননি। ১৮ মার্চের পরের তথ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামীকাল রোববার এ তথ্য জানানো সম্ভব হবে। তিনি আরও জানান, বিভাগের সব জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায় আক্রান্তদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং রাজশাহীর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
