বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রুদের একাংশের বিরুদ্ধে বিদেশি ভাতা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আনার অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে দেশ। এই প্রক্রিয়ায় সহায়তার অভিযোগ রয়েছে সংস্থাটির অর্থ পরিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও। বিষয়টি তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিভাগ। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নাম আসা রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সটির এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক চিঠি বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে এখনও অনুসন্ধান চলছে। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে কেবিন ক্রুদের বিদেশি ভাতা পৃথক পৃথক চেকের মাধ্যমে উত্তোলনের প্রচলন ছিল। তবে গত মে মাসে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে; ১৯টি ওভারসিজ অ্যালাউন্স বিলের বিপরীতে মোট ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহাম, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা সমপরিমাণ অর্থ একটি মাত্র চেকের মাধ্যমে উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়। চেকটি ইস্যু করা হয়েছিল কেবিন ক্রু সদস্য এফএফ মো. আব্দুস শাকুর মুজাহিদের নামে এবং জনতা ব্যাংকের দুবাই শাখা থেকে পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়।
পরদিন বাংলাদেশ বিমানের বিজি-২৪৮ ফ্লাইটে মুজাহিদসহ সংশ্লিষ্ট কেবিন ক্রুরা ঢাকায় ফেরেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের লাগেজ তল্লাশি করেন গোয়েন্দা সদস্যরা। কিন্তু ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহামের বিপরীতে পুরো ক্রু দলের কাছ থেকে পাওয়া যায় মাত্র ৭৮ হাজার ৩৬০ দিরহাম সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা। অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৭ দিরহাম বা ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অবশিষ্ট অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুবাইয়ে একটি মানি এক্সচেঞ্জের এজেন্টের কাছে অর্থ হস্তান্তরের পর বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট এক দেশীয় এজেন্ট নির্ধারিত ব্যক্তিদের কাছে সমপরিমাণ টাকা পৌঁছে দেয়। প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম হিসেবে না দেখে আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ভাতা পৃথকভাবে উত্তোলনের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে একজন ব্যক্তির হাতে এত বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো না। ওই ব্যতিক্রমী পদ্ধতির কারণেই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা হুন্ডির মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওই প্রতিবেদনে তৎকালীন চিফ ফাইন্যান্স অফিসার মিজানুর রশীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত পদ্ধতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে একক চেকের অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থ পরিচালক, দুবাই স্টেশনের অর্থ ব্যবস্থাপক, সংশ্লিষ্ট মানি এক্সচেঞ্জ এবং সম্ভাব্য হুন্ডি চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তের সুপারিশ করা হয়। ভবিষ্যতে প্রত্যেক কেবিন ক্রুর নামে পৃথকভাবে চেক ইস্যুর পরামর্শ দেওয়া হয় প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই প্রতিবেদনটি জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার জন্য জনতা ব্যাংক তাদের আরব আমিরাত শাখাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছে। জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কোনো কর্মকর্তা ব্যাংক হিসাব থেকে কত টাকা উত্তোলন করতে পারবেন, সে বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করার এখতিয়ার ব্যাংকের নেই। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত চেক ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে সেই অর্থ পরিশোধ করা ব্যাংকের দায়িত্ব।
ওই লেনদেনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, বিষয়টি সামনে আসার পর বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের জন্য দুবাই শাখাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার মধ্যেই গত ১৯ মে মিজানুর রশীদকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়, যদিও বরখাস্তের আদেশে কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার নাম আসার দিনই তাকে বরখাস্ত করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগের দিনই তিনি পদোন্নতি পেয়েছিলেন। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
