** গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি, উত্তরা, ওয়ারী, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, বসুন্ধরার মতো এলাকায় বহু গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস মালিক রিটার্ন দেন না, দিলেও প্রকৃত সম্পদ গোপন করেন
** আয়করের পাশাপাশি এসব অভিজাত এলাকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও আয়কর-ভ্যাট সঠিকভাবে পরিশোধ করে না
** ঢাকার পাশাপাশি বিভাগীয় শহরের বিলাসবহুল এলাকারও ডোর-টু-ডোর জরিপ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে
দেশের অভিজাত এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক স্পেস, বিলাসবহুল গাড়ি ইত্যাদির মালিকরা সঠিকভাবে কর দেন না। আবার অনেকেই এসব বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস থেকে কোটি কোটি টাকা ভাড়া দিলেও তার আয়কর ফাইলে সঠিকভাবে দেখান না। কেউ কেউ আয়কর ফাইলে সম্পদের তথ্যও গোপন করেন। যারা দেখান, তারাও সঠিক মূল্য এবং ভাড়ার পরিমাণ দেখান না। যার মাধ্যমে এসব এলিট শ্রেণির বাসিন্দারা বছরে বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিয়ে আসছেন। এছাড়া এসব অভিজাত এলাকায় বহু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও সঠিকভাবে কর ও ভ্যাট পরিশোধ করে না। আবার অনেকে কোটি কোটি টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট, গাড়ি, বাড়ি, বাণিজ্যিক স্পেস কিনলেও রিটার্ন জমা দেন না। অভিজাত এলাকায় এসব করফাঁকিবাজ করদাতাদের খুঁজে বের করতে ডোর-টু-ডোর জরিপ করার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই জরিপে অভিজাত এলাকার বাসিন্দাদের কর নথি যাচাই করা হবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনফোর্সমেন্ট বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। একইভাবে অভিজাত এলাকার বিপণী-বিতান থেকে ভ্যাট আদায় কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই নিয়ে নির্দেশনা থাকতে পারে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, নতুন করদাতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে এসব অভিজাত এলাকায় এই জরিপ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অভিজাত এলাকার মধ্যে রয়েছে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি, উত্তরা, ওয়ারী, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, বসুন্ধরা ইত্যাদি। শুধু ঢাকা নয় চট্টগ্রামের খুলশীর মতো বিভাগীয় শহর এবং অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও এই জরিপ এবং কর নথি যাচাই করা হতে পারে। বিভিন্ন মহলের অভিযোগ-যারা কর দেয়, এনবিআর শুধু তাদের ওপরই করের বোঝা চাপায়। আগামী অর্থবছর থেকে এই বদনাম ঘুচাতে চায় এনবিআর। সেজন্য করদাতার সংখ্যা বাড়াতে দেশের সব অভিজাত এলাকাগুলোয় আগামী অর্থবছরে সাড়াশি কর জরিপ চালাবে এনবিআর। কর জাল বৃদ্ধি ও সম্পদ কর আদায়ে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার বাজেট প্রস্তাবনার খসড়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন এনবিআর কর্মকর্তারা। আগামী অর্থবছর বিনাপ্রশ্নে কালোটাকা সাদা করার সুযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী অভিজাত এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক স্পেস, গাড়ির মালিকদের জরিপ করে করের আওতায় আনা এবং তাদের কর নথি যাচাইয়ের নির্দেশনা দেন। যার প্রেক্ষিতে এনবিআর আগামী অর্থবছরের বাজেটে ডোর-টু-ডোর জরিপের পরিকল্পনা করছে। বাজেটে এই নিয়ে নির্দেশনা থাকতে পারে। সঠিকভাবে জরিপ করা গেলে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে বলে মনে করেন কর্মকর্তারা। কর্মকর্তারা আরো বলছেন, বিনাপ্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে কি ফরমেটে সেই সুযোগ দেয়া হবে, করহার কত হবে-তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী বছর সম্পদ কর আদায়ে বেশি জোর দেয়া হবে। ১ শতাংশ হারে সম্পদ কর বসানো হলে এই খাত থেকে বছরে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আদায় হবে। এ জন্য জমির মৌজামূল্য বাজারভিত্তিক করতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কাজও শুরু হয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় মনে করে, কেবল প্রগ্রেসিভ কর ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ন্যায্যতা বাড়ানো সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যে সম্পদ করের প্রস্তাব এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন। এর মাধ্যমে উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীকে আরও কঠোর নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীকে যতটা সম্ভব কম কষ্ট দেওয়া।
অপরদিকে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর সংস্কারের প্রধান বাধা রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামো। আয়কর ব্যবস্থার আওতা সংকীর্ণ রেখে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে কর সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে। বিএনপি এই বৈষম্যমূলক কাঠামোর অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রতিবদ্ধ। উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও সম্পত্তির মালিকদের করজালের আওতায় আনা হবে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা, তথ্য বিনিময় ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করা হবে। একইসঙ্গে কর ছাড় ও প্রণোদনা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনা হবে। এতে আরও বলা হয়, বিএনপি আধুনিক সম্পত্তি কর ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ থেকে সৃষ্ট সম্পদ রাজস্বে রূপান্তরিত হবে এবং কর কাঠামোর ন্যায্যতা বাড়বে।
বাজেট সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজধানীর বনানী, গুলশানে মাঝারি সাইজের ২ হাজার স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট ৫-৬ কোটি টাকায় বিক্রি হয়। অফিস স্পেসের দাম তো আকাশছোঁয়া। যা উন্নত বিশ্বের চাইতেও কয়েকগুণ বেশি। এই লেনদেনগুলো কঠোর মনিটরিং করার মাধ্যমে যথাযথ কর আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পদের কীভাবে বৈধতা দেয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অবশ্য প্রথম বাজেটেই কালো টাকা সাদা করার মতো সুযোগ দিয়ে সমালোচনা উস্কে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী। তবে অন্য উপায়ে এটি করা যায় কিনা তা ভাবতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ভ্যাট আদায় বাড়াতে নামি-দামি শো-রুম, শপিংমল, রেস্টুরেন্টে নজরদারি বাড়ানো হবে। ইতিমধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাজেটের পর মাঠ পর্যায়ে প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেয়া হবে। এ জন্য ভিন্ন আঙ্গিকে নতুন শিল্পকে কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হবে। তবে এসব শিল্পে সানসেট ক্লজ যুক্ত করে দেয়া হবে। এর পরে ওই শিল্প আর অবকাশ সুবিধা পাবে না। আগে ৩২টি খাত কর অবকাশ সুবিধা পেত, যা অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করে দেয়। এ খাতগুলোর মধ্যে এ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্ট ও রেডিও ফার্মাসিউটিক্যালস; কৃষি যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল; ব্যারিয়ার কন্ট্রাসেপটিভ ও রাবার ল্যাটেক্স; ইলেক্ট্রনিক্সের মৌলিক উপাদান অর্থাৎ রেজিস্টর, ক্যাপাসিটর, ট্রানজিসটর, ইনটিগ্রেটেড সার্কিট, মাল্টিলেয়ার পিসিবি উৎপাদনখাতের মত কিছু খাতে—নতুন বিনিয়োগে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হ্রাসকৃত হারে কর সুবিধা পেতে পারে। এই তালিকায় আরও যুক্ত হতে পারে বাইসাইকেল ও এর খুচরা যন্ত্রাংশ; জৈব সার; জৈব প্রযুক্তি-ভিত্তিক কৃষি পণ্য; বয়লার; কম্প্রেসর ও এর যন্ত্রাংশ; কম্পিউটার হার্ডওয়্যার; হোম অ্যাপ্লায়েন্স; কীটনাশক ও বালাইনাশক; চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য; স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ; পেট্রোকেমিকেলস; ফার্মাসিউটিক্যালস; প্লাস্টিক রিসাইক্লিং; টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি; খেলনা উৎপাদন; টায়ার উৎপাদন; বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার; এবং অটোমোবাইল পার্টস ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন। এছাড়া অটোমেশন ও রোবোটিক্স ডিজাইন, ম্যানুফ্যাকচারিং ও এর পার্টস ও উপাদানসহ; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিস্টেম ডিজাইন এবং ম্যানুফ্যাকচারিং; ন্যানোটেকনোলজি ভিত্তিক পণ্য উৎপাদন এ সুবিধার আওতায় আসতে পারে।
