অবৈধ পথে ৫ বছরে ইউরোপ গেছেন ৯৮০০০ বাঙালী

মাদারীপুরের সাইদুর এক বছর আগে অবৈধভাবে স্থল ও সমুদ্রপথে গ্রিসে গেছেন। প্রথমে ওমান, পরে ইরান ও তুরস্ক হয়ে তিনি গ্রিসে প্রবেশ করেন। ওমান থেকে ইরানে যাওয়ার জন্য ছোট ট্রলারে ওঠা সত্ত্বেও পাঁচ দিন ধরে সমুদ্রে ভেসে থাকতে হয়েছে তাকে। ইরানের বন্দর আব্বাসে পৌঁছে মোটরসাইকেল ও হেঁটে, জঙ্গলে দিন কাটিয়ে তুরস্কে পৌঁছান। তুরস্ক থেকে গ্রিসে প্রবেশের সময় ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পার করতে হয়, তিন দিন জঙ্গলে অবস্থান করে সুযোগ বুঝে গ্রিসে ঢুকেন। এই যাত্রায় ১৭–১৮ দিন শুধু পানি পান করেছেন এবং মাঝে মাঝে এক বোতল পানি চারজন ভাগ করে খেয়েছেন। দালালদের কাছে শুধু সীমান্ত পারাপারের জন্য তিনি সাড়ে চার লাখ টাকা দিয়েছেন, আর পুরো যাত্রার খরচ হয়েছে ২০ লাখ টাকার বেশি।

শুধু সাইদুর নয়, প্রতিবার কাজের সন্ধানে হাজার হাজার বাংলাদেশী অবৈধভাবে পাহাড়, সমুদ্র ও জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করছেন। এই পথে মানব পাচার চক্র পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে, যেখানে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক পাচারকারীদেরও যুক্তি আছে। অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছলেও অধিকাংশের ভাগ্যে আসে দুঃসহ পরিণতি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বৈধ পথে ইউরোপে যাওয়া বাংলাদেশীর সংখ্যার প্রায় সমপরিমাণই অবৈধ পথে দালালের মাধ্যমে পৌঁছেছেন।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে অবৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ৯৭ হাজার ৮৩২ বাংলাদেশী। এর মধ্যে স্থল ও সমুদ্রপথে গেছেন ৫৮ হাজার ২৯ জন। আর পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে গেছেন ৩৯ হাজার ৮০৩ জন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, একই সময়ে কর্মী ভিসায় ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ৯৮ হাজার ৮৬৬ বাংলাদেশী।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত জীবন ও আর্থিক সচ্ছলতার কারণে ইউরোপে যাওয়ার প্রকৃত বাংলাদেশীর সংখ্যা আরও বেশি। বর্তমানে এটি একটি চলমান প্রবণতা। অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনার ব্যর্থতাকেও এ সমস্যার বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএমইটির তথ্যমতে, বৈধ পথে ২০২৪ সালে ইউরোপে গেছেন ২০ হাজার ৮৩৯ বাংলাদেশী, যা আগের বছরের অর্ধেকেরও কম। গত পাঁচ বছরে ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৪৬ হাজার ২৪২, ২০২২ সালে ২৩ হাজার ৮০৬, ২০২১ সালে ৬ হাজার ২৩৯ এবং ২০২০ সালে ১ হাজার ৭৪০ জন পাড়ি জমিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈধ পথে যাওয়ার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্থল ও সমুদ্রপথে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। স্থলপথে দালালের মাধ্যমে সাড়ে ২২ লাখ টাকা খরচ করে ইতালি পৌঁছেছেন হবিগঞ্জের সুমন মিয়া। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে প্রথমে দুবাই আসি। দুবাই থেকে লিবিয়া। সেখানে চার মাস থাকার পর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছি ছোট নৌকায়, তারপর ইতালি পৌঁছি। এত বড় ঢেউ ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। অনেক কষ্ট হয়েছে। দিনের পর দিন না খেয়ে, না ঘুমিয়ে স্বপ্নপূরণে ইউরোপে আসেন অনেকে। ইউরোপের নেশা এক ভয়ংকর নেশা। ঝুঁকি নিয়ে এভাবে কাউকে না আসার জন্য অনুরোধ করব।’ তিনি বলেন, ‘গ্রিস থেকে আলবেনিয়া হয়েও অনেকে ইতালি যায়। অনেকে ইরান হয়ে তুরস্কে প্রবেশ করছে। স্থলপথে যারা আসে তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে হয়। প্রথমে দালালের সঙ্গে চুক্তি করে ১১ লাখ টাকায় লিবিয়া আসি। সেখান থেকে ইতালি যেতে সাড়ে ২২ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে।’

আইওএমের ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেশন স্ন্যাপশট রিপোর্ট’-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ১৫ হাজার ৩০৪ বাংলাদেশী। ২০২৩ সালে গেছেন ১৩ হাজার ৭৭৩, ২০২২ সালে ১৬ হাজার ৪৮৭, আর ২০২১ ও ২০২০ সালে যথাক্রমে ৭ হাজার ৯৫৫ ও ৪ হাজার ৫১০ জন। একই সময়ে পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ২০২৪ সালে গেছেন ৩ হাজার ৪২৭ জন, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৮৬৩, ২০২২ সালে ১০ হাজার ৪০, ২০২১ সালে ৭ হাজার ৬২৯ ও ২০২০ সালে ৮ হাজার ৮৪৪ জন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থল ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশীদের প্রধান গন্তব্য ইতালি, গ্রিস, মাল্টা, সাইপ্রাস ও স্পেন, যেখানে ইতালি শীর্ষে। পাশাপাশি, পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো—স্লোভেনিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়া, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, নর্থ ম্যাসেডোনিয়া, মন্টেনেগ্রো ও কসোভো—ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৪ সালে এসব দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করেছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাংলাদেশী, ২০২৩ সালে সংখ্যাটি ছিল ৯ হাজার ৮৬৩। অনেকেই ট্রানজিট দেশগুলোতে আটকা পড়ে গেছেন।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মতে, অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে এবং এই প্রবণতা বাড়তেই থাকবে। ইউরোপীয় দেশগুলো কখনো কখনো অভিবাসন নীতি শিথিল বা আশ্রয়ের সুযোগ দেয়ায় মানুষরা ‘যেভেন পারি যাই’ মনের সঙ্গে রওনা দিচ্ছে এবং দেশে ফিরে আসার চিন্তা তাদের কাছে কমই থাকে। পুরনো উদাহরণগুলো দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ঝোঁক বেড়েছে। এছাড়া যেহেতু এতে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত, তাই বাংলাদেশ একা এ সমস্যা মোকাবেলা করতে পারবে না—আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলিকে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো দেশেরই বিশেষ সাফল্য নেই, আর এটাই অবৈধ অভিবাসনের এক বড় কারণ।

This will close in 5 seconds