অতিবৃষ্টি-পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে ২০ হাওরের ধান

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। পাকা ও আধাপাকা ধানক্ষেত চোখের সামনে ডুবে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হাহাকার দেখা দিয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হাওর ও নদীর পানি বাড়তে থাকায় নতুন করে আরও জমি ডুবে যাচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত এই বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। পানির চাপ বেড়ে দুই উপজেলায় দুটি বাঁধ ভেঙে ফসল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরে ৪৪ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। বোরো আবাদ এলাকার অর্ধেকের বেশি জমির ধান এখনো কাটা বাকি থাকলেও এরই মধ্যে বড় অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সদর, শান্তিগঞ্জ, শাল্লা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ছোট-বড় ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে। গত দুই দিনের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে এসব ফসল তলিয়ে যায়, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। হাওর ও নদীর পানি সমান উচ্চতায় থাকায় পানি নিষ্কাশনের সুযোগ নেই। কৃষকরা জানান, দুই দিন পানির মধ্যে ধান কাটার চেষ্টা করলেও এখন আর কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
Sunamganj 2
কয়েকজন কৃষক জানান, এপ্রিলের মাঝামাঝিতে জামালগঞ্জের পাগনার হাওর, হালির হাওর, মধ্যনগরের চিন্নির হাওর, টগার হাওর, দেখার হাওর ও কানলার হাওরের প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গিয়ে বেশিরভাগ ধান নষ্ট হয়ে যায়। সে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার নতুন করে আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। শাল্লা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশার কৃষকেরা বলেন, জমির ফসল ডুবে যাওয়ায় তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। হাওরে পানির চাপ, বজ্রপাতের আতঙ্ক, শ্রমিক সংকটসহ নানা সমস্যায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। সোমবার রাত ও মঙ্গলবার সকালের ভারী বৃষ্টিতে অনেক হাওরের ধান তলিয়ে গেছে, পাশাপাশি পানি বেড়ে যাওয়ায় শুকানোর খলায় রাখা ধানও নষ্ট হচ্ছে।

পানির চাপে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলোও চরম ঝুঁকির মধ্যে আছে। আজ সকালে জেলার মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের চান্দালীপাড়া গ্রামে ইকরাছই হাওরের একটি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে গেছে। দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধও পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। বাঁধ দুটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাভুক্ত নয়। স্থানীয় লোকজন সংস্কার করেছিলেন। এ ছাড়া দুপুরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের হরিমণের বাঁধ উপচে হাওরে পানি ঢুকেছিল। সকাল থেকে পাউবো কর্মকর্তারা ওই বাঁধে অবস্থান করছিলেন। বাঁধটির কাজ গত বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলে সেটি হয়নি।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত ৯৯ হাজার ৪৮৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, অর্থাৎ হাওর ও নন-হাওর মিলিয়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। হাওরে ধান কাটায় এখন কৃষকরা মূলত হারভেস্টার মেশিনের ওপর নির্ভর করলেও অনেক এলাকায় পানি থাকায় এসব মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে শিলাবৃষ্টিতে ৫৩৮ হেক্টর এবং জলাবদ্ধতায় ১ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি দ্রুত না নামলে আরও জমির ধান পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকরা মাঠে আছেন। চেষ্টা করছেন ধান তোলার জন্য। আমরাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ, সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু গত দুই দিনের বৃষ্টি ও ঢলে অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেছে।’
Sunamganj 1
কৃষকরা বলছেন, প্রতিকূল আবহওয়ার কারণে ধান শুকাতেও পারছেন না তারা। বজ্রাঘাতের কারণে হাওরে ধানকাটা শ্রমিকের সংকট। অপর দিকে অতিবৃষ্টিতে ক্ষেতে কোমর পর্যন্ত পানি জমে আছে। সুমেশ্বরী, যাদুকাটা, মনাই, খাসিয়ামারা, চেলা, পিয়াইনসহ সীমান্ত এলাকার নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ অনেক বেড়েছে। ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের সুখাইড় গ্রামের কৃষক সুষেন পাল বলেন, ‘নিচু জমি হওয়ায় আমার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। জমিতে কোমরসমান পানি জমেছে। তাই মেশিনে কাটাও যায় না। শ্রমিকের মজুরিও বেশি। মাড়াই খলায় মজুত করা ধানগুলো শুকানোও যাচ্ছে না।’

বাগবাড়ি গ্রামের কৃষক হরিধন দাস বলেন, ‘মহা দুশ্চিন্তায় আছি। বৃষ্টির কারণে যেসব ধান কেটেছি সেগুলো শুকানো যায় না, আবার যেগুলো ক্ষেতে আছে সেগুলো গেছে ডুবে। আমাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে বৃষ্টি।’ সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘কৃষকদের সমস্যা নিরসনে কাজ করছে সরকার। ধানকাটার মেশিনের জন্য জ্বালানির সংকট নেই। হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় ধান কাটা চলছে। তাই শ্রমিকের সংকট আছে। বিভিন্ন জেলায় ধানকাটা শ্রমিকের জন্য যোগাযোগ করছে জেলা প্রশাসন।’