আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে প্রথমবারের মতো অগ্রিম আয়করের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সিএনজিচালিত থ্রি হুইলারসহ প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ, বাস ও ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের ক্ষেত্রে এই কর আদায় করা হয়। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রাম ও শহরভেদে এই খাতে করের হার ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রাথমিক চিন্তা চলছে। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে এই হার কমিয়ে অর্ধেক করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারি কোনো দপ্তরে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় এই সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, এসব অটোরিকশার ৯০ শতাংশই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারও কারও মতে, রাজধানী ঢাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ হতে পারে।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, সারা দেশে অটোরিকশার সংখ্যা ১ কোটির কম হবে না। সে হিসাবে গড়ে যদি ১ হাজার টাকা করেও কর আদায় করা যায়, তাহলে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে। বাজেট তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনীহা জানিয়ে বলেন, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে অটোরিকশা থেকে কর আদায়ের বিষয়টি এখন পর্যন্ত সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তবে কত টাকা করে আদায় করা হবে, সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অবশ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার বার্ষিক নিবন্ধন ফি বা কর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫ হাজার টাকা, পৌরসভায় ২ হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে যথাক্রমে সিটি করপোরেশনে ২ হাজার ৫০০ টাকা, পৌরসভায় ১ হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ৫০০ টাকা নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা চলছে। রাজস্ব কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে নীতিমালার মাধ্যমে এসব রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমানে ঢাকায় নিবন্ধন কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে প্যাডেলচালিত রিকশাচালকদের দায়ের করা মামলার কারণে, যেখানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় না আনার দাবি জানানো হয়েছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে গত বছর ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’-এর খসড়া তৈরি করে সরকার। ওই খসড়ায় নিবন্ধন সনদ, হালনাগাদ ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেন নেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রে এনবিআর নির্ধারিত হারে শুল্ক ও কর আদায়ের কথাও উল্লেখ রয়েছে।এদিকে গত বছরের ২৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ সংশোধন করা হয়। এতে সিটি করপোরেশনকে ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলারের নিবন্ধন ও অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, যানবাহনের মালিকদের প্রতিবছর গাড়ির ফিটনেস নবায়নের সময় নির্ধারিত হারে অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। একইভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল মালিকদের ভবিষ্যতে অগ্রিম আয়কর দিতে হবে। এদিকে করারোপ নিয়ে অটোরিকশাচালকেরা অবশ্য চিন্তিত নন। কারণ, ঢাকার অধিকাংশ অটোরিকশাই ভাড়ায় চলে। করের ভার নেবেন মহাজন বা মালিকেরা। তাই কর নিয়ে শঙ্কিত নন চালকেরা। কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলে এমন বক্তব্যই পাওয়া গেছে।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে এসে তিন বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন জজ মিয়া। তিনি রবিবার জানান, মহাজনেরা ইতিমধ্যে করের বোঝা বহন করবেন বলে জানিয়েছেন। ফলে নতুন করে জমার (ভাড়া) পরিমাণ না বাড়ানোর আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি দৈনিক ৪০০ টাকা জমা দিয়ে রিকশা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে দিনাজপুরের পার্বতীপুরের সুলতান মিয়া পাঁচ বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, চিকন চাকার অটোরিকশা সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের আয় কমে গেছে। তার মতে, হাইড্রোলিক ব্রেকযুক্ত অটোরিকশা নিবন্ধন ও অনুমোদন পেলে রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আসবে, ফলে আয় কিছুটা বাড়তে পারে।
