স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ প্রস্তুত করেছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন—প্রতিটি নির্বাচনের জন্য আলাদা রোডম্যাপ করা হয়েছে, যা চলতি মাসের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে তপশিল ঘোষণা করে অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, সারাদেশকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করে এই নির্বাচন আয়োজন করা হবে—হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকা, নদীপ্রধান ও চরাঞ্চল এবং সমতল ও শহরাঞ্চল। এর মধ্যে হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ভোটের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করার জন্য মাঠ পর্যায়ে চিঠি দেওয়া হবে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর হবে, তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। সূত্র আরও জানায়, অক্টোবরের প্রথমার্ধে ভোটের সময় ধরে ৪১ থেকে ৪৫ দিন আগে তপশিল ঘোষণার ব্যবস্থা করা হতে পারে। প্রতি বুথে নারী ভোটার ৫০০ এবং পুরুষ ভোটার ৬০০ জন নির্ধারণ করা হবে। ঋণখেলাপি সংক্রান্ত আইন পর্যালোচনা করতেও বলা হয়েছে।
রোডম্যাপে আরও যা থাকছে
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাথমিক রোডম্যাপে ধাপভিত্তিক নির্বাচনের কিছু চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলা হয়েছে, অতীতে এক ধাপের নির্বাচন থেকে অন্য ধাপের নির্বাচনের সময়ের ব্যবধান কম ছিল। এতে মাঠ পর্যায়ে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই, আপিল নিষ্পত্তি, প্রতীক বরাদ্দ, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও ব্যালট পেপার পরিবহনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের সময়ের ব্যবধান কম থাকায় ভোটকেন্দ্রসহ আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হয়।
নির্বাচনের সময় ও ধাপ নির্ধারণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, অতীতে কখনো কয়েকটি ধাপে আবার কখনো একযোগে সারাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এবার ধাপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য—যেমন হাওর, চরাঞ্চল ও পার্বত্য জেলা—এছাড়া আবহাওয়া, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা এবং ধর্মীয় উৎসবকে গুরুত্ব দিয়ে সময়সূচি ঠিক করা হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের সময় নির্ধারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক একাডেমিক ক্যালেন্ডার, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি রোডম্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধি সংশোধনের কাজ শেষ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তপশিল ঘোষণার আগে ও পরে সম্পন্ন করতে হবে এমন সব কার্যক্রমের সারসংক্ষেপও রোডম্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তপশিল ঘোষণার পূর্ববর্তী প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে আইন ও বিধিমালা সংশোধন, সংশোধিত কাঠামোর ভিত্তিতে ম্যানুয়াল ও নির্দেশিকা প্রণয়ন ও চূড়ান্তকরণ, নির্বাচন পরিচালনা ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সরঞ্জাম ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সংগ্রহ ও ব্যবহার উপযোগী করা। পাশাপাশি ম্যানুয়াল, ফরম, প্যাকেট, প্রশিক্ষণ উপকরণ, পোস্টার, পরিচয়পত্র ও অন্যান্য নির্বাচনী সামগ্রী প্রস্তুত, মুদ্রণ ও বিতরণ করা হবে। মনোনয়নপত্র ও তা পূরণের নির্দেশিকা, ব্যালট পেপারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী মাঠ পর্যায়ে পাঠানো হবে। এছাড়া নির্বাচনের আগে ও পরে বাজেট প্রণয়ন ও বরাদ্দের কার্যক্রম সম্পন্ন করা, ছবিসহ ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণে খসড়া প্রকাশ, দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তি ও অনুমোদন এবং ভোটগ্রহণের অন্তত ১৫ দিন আগে গেজেট প্রকাশের বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তপশিল ঘোষণার ১৫ দিন আগে সেনাবাহিনীসহ সব বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করা হবে। এরপর প্রচারসামগ্রী অপসারণ, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল প্রস্তুত করে তপশিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। তপশিল ঘোষণার পর করণীয় হিসেবে বলা হয়েছে, রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ, নির্বাহী হাকিম ও বিচারিক হাকিম নিয়োগসহ বিভিন্ন পরিপত্র জারি করবে ইসি। অভিযোগ গ্রহণে অঞ্চলভিত্তিক কর্মকর্তা নিয়োগ, ঋণখেলাপিদের তথ্য সংগ্রহে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত পরিপত্র জারি ও বৈঠক করা হবে। এ ছাড়া ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল চূড়ান্ত, ট্রাইব্যুনাল গঠন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের ভোট পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হবে।
ভোট গ্রহণের দিনের কার্যক্রম হিসেবে রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ফলাফল সংগ্রহ ও বিতরণ, ডাকযোগে ফলাফল গ্রহণ, ভোট গ্রহণের ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ এবং ৬ থেকে ৭ দিনের মধ্যে নির্বাচিত প্রার্থীদের নামে গেজেট প্রকাশ করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদের। ২০২১-২২ অর্থবছরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩ হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে। মামলা, সীমানা জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন নির্বাচন হয়নি ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদের। দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ ৪ হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছরেই নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৯৮১টি। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।
পৌরসভা নির্বাচনের রোডম্যাপ অনুযায়ী, দেশের ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি বর্তমানে নির্বাচনের জন্য উপযোগী, আর আইনি জটিলতার কারণে ১০টি পৌরসভায় ভোট আয়োজন সম্ভব নয়। উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রে কোনো উপজেলাতেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সবগুলোই নির্বাচনের উপযোগী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে নতুন সিটি করপোরেশন বগুড়াসহ মোট ১৩টি সিটি করপোরেশনের কোথাও নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবগুলোতেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, অক্টোবরকে লক্ষ্য ধরে প্রস্তুতি এগোচ্ছে এবং সে ক্ষেত্রে অন্তত ৪৫ দিন আগে তপশিল ঘোষণা করা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রায় ৮০ শতাংশ নিশ্চিতভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই এই প্রক্রিয়া শুরু হবে, পাশাপাশি পৌরসভা নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছে। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি জানান, ব্যালট বাক্স প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের কাজও এগিয়ে চলছে।
